কথিত হিজরতের নামে ঘর ছেড়ে যাওয়া কুমিল্লার সাত তরুণকে জঙ্গিবাদে জড়ানোর মূল ‘কারিগরকে’ শনাক্ত করা গেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। তাঁর নাম শাহ মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। তিনি কুমিল্লা শহরের একটি মসজিদের ইমাম। তিনিও এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গ্রেপ্তার এড়াতে হাবিবুল্লাহ গা ঢাকা দিয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে সাত তরুণের ‘হিজরতের’ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক কর্মীকেও খুঁজছে র‌্যাব। তাঁর নাম মো. নেছার উদ্দিন (৩৪)। তাঁর স্ত্রী সোনিয়া বেগম গতকাল বলেন, নেছার বারির ভোলা অফিসে উপসহকারী কর্মকর্তা।

তিনি চার-পাঁচ দিন ধরে নিখোঁজ। নেছার ভোলায় থাকতেন। পরিবার পটুয়াখালীতে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। প্রতি শুক্র-শনিবার নেছার বাড়ি আসতেন। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও স্বামীর বিষয়ে কিছু জানতে পারেননি।

কুমিল্লার ৭ কলেজছাত্র গত ২৩ আগস্ট বাড়ি ছাড়েন। কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান গতকাল বলেন, এখনো সাত ছাত্রকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁদের ব্যাপারে তদন্ত চলছে।

পুলিশের পাশাপাশি এই সাত তরুণের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে র‌্যাবও। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই তরুণেরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য। তাঁদের উগ্র মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করার মূল কারিগর কুমিল্লা মসজিদে কোবার ইমাম (কেবল ওয়াক্ত নামাজ পড়াতেন) শাহ মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ।

এই তরুণেরা কোবা মসজিদে নামাজ পড়তেন, সেই সূত্রে তাঁরা ইমাম হাবিবুল্লাহর কাছে ধর্মীয় বিভিন্ন নিয়মকানুন জানতে চাইতেন। একপর্যায়ে তাঁদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেন। পরবর্তী সময়ে সন্দেহ এড়াতে তাঁরা কখনো নুর মসজিদে, কখনো ধর্মসাগরের পাড়ে পার্কে মিলিত হতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

‘নিখোঁজ’ তরুণদের একজন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আমিনুল ইসলাম ওরফে আল আমিন। তাঁর বাবা মো. নুরুল ইসলাম গতকাল বলেন, তাঁর ছেলে কোবা মসজিদে নামাজ পড়তেন। এখনো ছেলের খোঁজ পাননি। কোনো মতবাদে জড়িয়েছে কি না, তাঁর জানা নেই।

তবে ‘নিখোঁজ’ ইমাম সম্পর্কে জানতে চাইলে মসজিদে কোবার সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল হক বলেন, হাবিবুল্লাহ ১০ সেপ্টেম্বর দুই দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি যান। এরপর আর ফেরেননি। পরে খোঁজ করে জানতে পারেন, তিনি ১২ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ।

সাইফুল হক বলেন, হাবিবুল্লাহ কোনো জঙ্গি সংগঠনে জড়িত কি না, তাঁর জানা নেই। তবে তিনি তাবলিগ নিয়ে আলোচনা করতেন। গত মাসে যেসব তরুণ ‘নিখোঁজ’ হয়েছেন, তাঁরা এই মসজিদে নামাজ পড়তেন। তিনি জানান, এক বছর আগে কুমিল্লা থেকে আহমেদ উল্লাহ ও নাহিদ নামের দুই তরুণ নিখোঁজ হন। তাঁরাও এই মসজিদে নামাজ পড়তেন।

হাবিবুল্লাহ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের লইপুরা এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বড় ভাই কুমিল্লার চৌয়ারা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক শাহ মো. অলিউল্লাহ বলেন, ১২ সেপ্টেম্বর সকালে হাবিবুল্লাহ বাড়ি আসেন এবং সকাল নয়টায় বের হয়ে যান। এরপর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় ১৬ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানায় জিডি করা হয়। অলিউল্লাহর দাবি, তাঁর ভাই জঙ্গিবাদে জড়িত নয়। তিনি পদুয়ার বাজার মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন গতরাতে বলেন, কুমিল্লার সাত তরুণ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা কাজ শুরু করে। এই তরুণেরা যে আনসার আল ইসলামের সঙ্গে জড়িত, এ–সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।

তাঁদের কথিত হিজরতে ভূমিকা আছে, তদন্তে এমন একজনের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি কুমিল্লার কোবা মসজিদের ইমাম শাহ মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। তিনি এখন পলাতক। তাঁর অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাঁকে পাওয়া গেলে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যাবে।