২৫ মিলিয়ন ডলারের উৎস এখনও অজানা

ওবায়দুল্লাহ রনি

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ঠেকাতে ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেন এ মামলায় অভিযুক্ত মীর কাসেম আলী। ওই ফার্মকে ২৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ২১২ কোটি টাকা) পরিশোধ করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকরের প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু এ অর্থের উৎস এখনও জানতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। কে বা কারা অর্থ পরিশোধ করেছে, বাংলাদেশ থেকে কোন প্রক্রিয়ায় পাচার হয়েছে- এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু এটুকু জানতে পেরেছে, ২৫ মিলিয়ন ডলার নগদে পরিশোধ করা হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমের নামে এ অর্থ পরিশোধের ব্যাপারে তদন্তের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈঠক হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান ক্যাসিডি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসকে ২৫ মিলিয়ন ডলারে নিয়োগের তথ্য পায় সরকার। এ বিষয়ে ২০১০ সালের ৬ অক্টোবর ওয়াশিংটনে দু’পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন মীর কাসেম আলী। আর ক্যাসিডির পক্ষে সই করেন অ্যান্ড্রিও জে ক্যামিরস নামের একজন ব্যক্তি। ২০১২ সালের মাঝামাঝি চুক্তির বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানতে পারে। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এ বিষয়ে তথ্য চেয়ে বিএফআইইউতে চিঠি দেয় দুদক।
গতকালের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, কোনো একটি সূত্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি বিএফআইইউ নিশ্চিত হয়েছে। লবিস্ট ফার্মকে ওই অর্থ নগদে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে এ অর্থ পাঠানো হয়েছিল, নাকি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেউ পরিশোধ করেছিল- তা জানা যায়নি। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
সংশ্নিষ্টরা জানান, সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে এ ধরনের অর্থ পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই। সাধারণভাবে আমদানিতে বেশি মূল্য দেখিয়ে কিংবা রপ্তানিতে কম দাম দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হয়। এ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাঠানো হয়েছে কিনা, তা যাচাই করেছে বিএফআইইউ। আর এ জন্য মীর কাসেম আলী ও তার পরিবার এবং জামায়াতে ইসলামী সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানির তথ্য যাচাই করা হয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে এ অর্থ পাঠানো হয়েছিল কিনা, তাও যাচাই করে কোনো তথ্য মেলেনি। এ পর্যায়ে মীর কাসেম আলীর ফাইলটি নথিভুক্ত করা হবে কিনা, গতকালের বৈঠকে তা আলোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, নথিভুক্ত নয়; বরং আরও তদন্ত চলবে।
এ বিষয়ে বিএফআইইউর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মীর কাসেম আলীর অর্থ পরিশোধের বিষয়ে আরও তদন্ত করা হবে। প্রাথমিক অগ্রগতির তথ্য শিগগির দুদকসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও এ নিয়ে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধী ও ব্যবসায়ী মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর হয় ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাতে। তিনি কেয়ারী গ্রুপ নামে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন। তিনি জামায়াতের অর্থের জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০১২ সালের ১৭ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাসেমের বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুটি অভিযোগে মীর কাসেমের ফাঁসি ও আটটি অভিযোগে কারাদণ্ড হয়।