স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ জিয়ার অবদান

মীর নেওয়াজ আলী। জিয়াউর রহমান জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। শেখ মুজিবুর রহমান-এর দিকনির্দেশনা না থাকায় পাকবাহিনীর গণহত্যা ও প্রচন্ড নির্যাতনের মুখে জাতি যখন হতাশ ও বিভ্রান্ত, ঠিক তখনই আশার আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন সেদিনের মেজর জিয়াউর রহমান। নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে আহবান জানিয়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার। তার সে ঘোষণা ও আহবান জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। হতাশা ও বিভ্রান্তি কাটিয়ে জাতি যুদ্ধে নেমে পড়েছিল। তিনি নিজেও যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানকে কেউ খাটো করে দেখলে ভাবতে হবে সে একজন মুর্খ, সে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানেনা এবং যে জানে কিন্তু অস্বীকার করে সে একজন জ্ঞান পাপী এবং সে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেই বিশ্বাস করে না। দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজী রেখে স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেদিন জিয়ার অগ্রণী ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে স্বীকার না করা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জিয়াউর রহমানের অবদান অঙ্গাংগীভাবে জড়িত।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর বর্বরের মতো ঘৃণ্য হামলা চালায়। সে রাতে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিবুর রহমান বন্দী হন। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ চলে যান আত্মগোপনে। জনগণ তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলো। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে বিদ্রোহ করেন এবং ২৭শে মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
জিয়াউর রহমান এবং তাঁর বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁরা বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধপরিচালনা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। জিয়াউর রহমান এবং তাঁর বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁরা বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে কৌশলগতভাবে তাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করেন। একাত্তরের রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমানের বীরত্বগাথা লিখে শেষ করা যাবে না। তিনিই প্রথম ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত করেন। ২৭ মার্চ তিনিই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ৩০ মার্চ জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দেন। রণাঙ্গনে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সবসময় সামনে থাকতেন এবং কমান্ডারদের সৈনিকের সামনে থাকতে পরামর্শ দিতেন।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের দু’দিন আগে সিলেটের এমসি কলেজের পাশ দিয়ে সিলেট শহরে ঢোকার আগে পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যাপক গোলাবর্ষণের শিকার হয়েছিলেন জিয়ার বাহিনী। এ পরিস্থিতিতে সহকর্মীরা তাকে পিছিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সবাই মরে গেলেও সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন ।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, বিশেষ করে রণক্ষেত্রে তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। রণক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের অভিজ্ঞতা অনেক আগের। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি অসাধারণ রণনৈপুণ্য দেখিয়ে সবার দৃষ্টি কাড়েন তখন। তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন অফিসার হিসেবে ওই যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি নৈপুণ্য দেখিয়েছিল প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। ১৯৭১ সালের আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে তিনি অসীম সাহস এবং বীরত্ব দেখান। তিনিই প্রথম পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি যখন বিদ্রোহ ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করলেন, তখন তিনি দেখলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যসংখ্যা মাত্র ৩শ’। তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক ছিলেন। মাত্র সাতজন অফিসার এবং ৩শ’ সৈন্য নিয়ে ছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য এবং অপ্রতুল অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি প্রথমে তার বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এই বিদ্রোহ ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ, যা জিয়াউর রহমানের মতো নায়কের পক্ষেই সম্ভব ছিল।