স্ত্রী ঘরের কাজ করেন, সেজন্য মজুরী দিতে চীনের আদালতের রায়

বিবিসি । পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে গৃহকর্মের মজুরী হিসাবে স্ত্রীকে ৫০ হাজার ইউয়ান (৭,৭০০ ডলার) ক্ষতিপূরণ দিতে স্বামীকে নির্দেশ দিয়েছে চীনের একটি আদালত।

বিবাহবিচ্ছেদের এক মামলায় বেইজিংয়ের এক আদালতের এই রায়কে যুগান্তকারী হিসাবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

বিশ্বের বহু দেশের মত চীনেও গৃহকর্ম এবং সন্তান লালন-পালনে নারীকেই একচেটিয়া চাপ নিতে হয়। সে কারণে আদালতের এই রায়ের পর চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অনেকেই মন্তব্য করছেন, এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অনেক কম।

আদালতের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, পাঁচ বছর দাম্পত্য জীবন যাপনের পর চেন নামে ঐ ব্যক্তি গত বছর বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেন। ওয়াং নামে ঐ নারী প্রথমে বিবাহবিচ্ছেদে আপত্তি করলেও পরে মেনে নেন, কিন্তু পাঁচ বছরের গৃহকর্ম এবং একমাত্র ছেলের লালন-পালনের জন্য স্বামীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

মিজ ওয়াং আদালতে বলেন, তার স্বামী এসব কাজে তেমন কোনো সাহায্যই করেননি।আদালত ঐ নারীর দাবি মেনে নেন এবং প্রতি মাসে ২০০০ ইউয়ান খোরপোষ ছাড়াও গত পাঁচ বছরের গৃহকর্ম এবং সন্তানের দেখাশোনার মজুরী হিসাবে এককালীন ৫০,০০০ ইউয়ান ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য স্বামীকে নির্দেশ দেয়।

ঐ আদালতের বিচারক সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, বিবাহ বিচেছদ হলে স্থাবর সম্পত্তি আধাআধি ভাগ হয়। কিন্তু, তিনি বলেন, “গৃহকর্মেরও একটি মূল্য রয়েছে।“

চীনে এ বছর নতুন এক পারিবারিক আইন জারীর পর আদালত এই রায় দিল। নতুন এই আইনে বলা হয়েছে, দাম্পত্য জীবনে যিনি সন্তান পালন বা বয়স্কদের দেখাশোনার জন্য অধিকতর দায়িত্ব পালন করবেন, বিবাহ বিচ্ছেদের সময় তিনি সেসব কাজের ক্ষতিপূরণ পাবেন। এমনকি বিবাহিত জীবনে স্বামীর ব্যবসা বা অন্য কোনো আয়ে তার ভূমিকা থাকলে তার ক্ষতিপূরণও তিনি পাবেন।

চীনে গত বছর পর্যন্ত বিবাহ বিচ্ছেদের পর কোনো সঙ্গী এসব ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারতেন যদি বিয়ের আগে তাদের মধ্যে তেমন কোনো চুক্তি থাকতো। তবে বিয়ের আগে এমন কোনো চুক্তি করার চল চীনে নেই বললেই চলে।

‘বিয়ের পর চাকরি ছাড়বেন না‘

বাড়িতে চীনা বাদাম ভাঁজছেন বাংলাদেশি এক নারী। একজন নারীকে পরিবারে গড়ে এ ধরণের ১২টি ‘অবৈতনিক‘ কাজ করতে হয়, যেখানে পুরুষকে করতে হয় তিনটিরও কম।

সোশাল মিডিয়ায় সোমবারের এই রায় নিয়ে বিতর্কের ঝড় চলছে চীনে। চীনা মাইক্রোব্লগিং প্লাটফর্ম উইবোতে এই রায় সম্পর্কিত এক হ্যাশট্যাগে ৫৭ কোটি হিট হয়েছে।

অনেক মানুষ মন্তব্য করছেন যে পাঁচ বছরের কাজের জন্য ৫০ হাজার ইউয়ান নস্যি মাত্র।

একজন মন্তব্য করেছেন, “আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। একজন সার্বক্ষণিক গৃহবধূর কাজের সঠিক হিসাব বা মর্যাদা করা হয়নি। বেইজিংয়ে একটি বাচ্চার দেখাশোনা করার জন্য একজন আয়া রাখতে এক বছরেই ৫০ হাজার ইউয়ানেরও বেশি খরচ হয়।“

আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “নারীদের বলছি, মনে রাখবেন আপনাদের স্বাবলম্বী হতে হবে। বিয়ের পর চাকরি ছাড়বেন না।“

গবেষণা সংস্থা ওইসিডির এক হিসাব বলছে, এখনও চীনা নারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার ঘণ্টা কাজ করেন যার কোনো মজুরী তারা পাননা। একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারী বিনা মজুরীতে আড়াই গুণ বেশি কাজ করে।

বাংলাদেশের চিত্র

পরিবারে নারীর কাজের স্বীকৃতি বা মূল্যায়নের ঘাটতি নিয়ে বিতর্ক বা উদ্বেগ শুধু চীনে নয়, সারা বিশ্বেই কম-বেশি রয়েছে।

বাংলাদেশে এক গবেষণা বলছে, পরিবারে একজন নারী গড়ে প্রতিদিন আট ঘণ্টা এমন সব কাজ করেন যার জন্য কোনো অর্থনৈতিক প্রতিদান তিনি পাননা। পক্ষান্তরে, পরিবারের পুরুষ সদস্যটি এ ধরণের বিনা মজুরীর কাজ করেন গড়ে মাত্র আড়াই ঘণ্টা।

একজন নারীকে পরিবারে গড়ে এ ধরণের ১২টি ‘অবৈতনিক‘ কাজ করতে হয়, যেখানে পুরুষকে করতে হয় তিনটিরও কম।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) ২০১৪ সালে ৬৪টি জেলায় এই গবেষণাটি চালিয়েছিল।

সিপিডির গবেষক তৌফিক ইসলাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংসারে এবং পরিবারে নারীর কাজের স্বীকৃতির দারুণ ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশে, এবং এ নিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র তেমন সচেতনও নয়, তৎপরও নয়।

“ধরুন যে লোকটি রাস্তায় মুড়ি বিক্রি করছে, সেই মুড়ি তৈরি বা অন্যান্য কাজে তার ভূমিকার কথা কেউ ভাবেই না। আমরা কৃষকের আয়ের কথা বলি, কিন্তু ক্ষেতে বা ধান মাড়াই বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো যে ঐ পরিবারের যে নারীদের করতে হয় তাদের কাজের কোনো মূল্যায়ন বা স্বীকৃতিই নেই।“

তিনি বলেন, নারীকে যত মূলধারার কাজে যুক্ত করা যাবে, ততই তার কাজের স্বীকৃতি বাড়বে এবং তিনি কাজের প্রতিদান পাবেন। “সেই সাথে অবকাঠামোর উন্নতি করে নারীর ওপর অবৈতনিক কাজের অসহনীয় চাপ কমানো যায়। যেমন চাইল্ড কেয়ারের সুবিধা বাড়লে নারীর ওপর থেকে সাংসারিক কাজের চাপ কমবে।“

মি. খান বলেন, বিশ বা পঞ্চাশ বছর আগের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হয়েছে এবং হচ্ছে।

“কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সে তুলনায় নারীর কাজের মূল্যায়নের বিষয়টি কি সমভাবে এগিয়েছে? সেটাই বড় প্রশ্ন।“