সিলেটে আড়াইশ হোটেল-মোটেলে লেগেছে প্রাণের ছোঁয়া।

হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট

বৃহত্তর সিলেটের পর্যটন ব্যবসায় কিছুটা চাঙ্গা ভাব বিরাজ করছে। ১৯ আগস্ট থেকে সবকটি পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ায় এই খাতে জড়িত সিলেটের প্রায় ৩০ হাজার কর্মী নতুন উদ্যমে কাজে নেমেছেন। পর্যটকেরা ধীরে ধীরে আসতে শুরু করেছেন। আড়াইশ হোটেল-মোটেলে লেগেছে প্রাণের ছোঁয়া।

‘আমরা অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। পর্যটকদের আগমন ঘটলে কোনোভাবে দাঁড়াবার পথ হবে’- জানালেন পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যবসায়ী। যদিও করোনার তাণ্ডব এখনো শেষ হয়নি।

শুক্রবারও সিলেটে করোনায় ১০ জনের মৃত্যু ঘটে ও ১৮৮ জন নতুন করে আক্রান্ত হন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। অবশ্য স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ কঠোর। ‘সব কিছু মাথায় রেখেই জীবন-জীবিকার যৌথ প্রচেষ্টা চলছে’, মন্তব্য করেন একাধিক হোটেল-মোটেল মালিক।

এদিকে বৃহত্তর সিলেটে হাওরকে ঘিরে পর্যটন ব্যবসায় নতুন মাত্রা যোগ হতে চলেছে। এবার করোনাকালে দেখা গেছে বৃহত্তর সিলেটের হাওর এলাকার প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বেশি। মনে করা হচ্ছে, আগামী দিনে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা- হাওর। হাওর পাড়ে গভীর নীল আকাশের নিচে স্বচ্ছ কাঁচঘেরা রিসোর্ট, বনবনানী দারুণভাবে আকৃষ্ট করে পর্যটকদের।

নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, মিঠা পানির দেশীয় তাজা মাছ, বিষমুক্ত সবজি, দেশি মুরগিসহ টাটকা খাবার হাওর এলাকার বাড়তি আকর্ষণ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী শুক্রবার এসেছিলেন রামসারভুক্ত এলাকায় টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে। তারা টাঙ্গুয়ার বিশাল নীল জলরাশিতে অবগাহন করে বড়ই তৃপ্ত।

সৌন্দর্যপিপাসু মানুষেরা তাই ছুটছে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকাগুলোতে। সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে খাসিয়া-জৈন্তার পাদদেশে, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থেকে দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ সদর ও জামালগঞ্জের হাওরগুলো বর্ষাকালে পানিতে ভরে ওঠে, যা পর্যটকদের নয়ন-মন মাতিয়ে দেয়। সিলেটের চা-বাগান, ঝর্ণা, পাহাড়-টিলা, লতাগুল্ম, বনবনানী, বিছনাকান্দি, জলারবন রাতারগুল, জাফলং, মাধবকুণ্ডের পাশাপাশি হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন স্পটগুলো এখন পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। হাওরভিত্তিক পর্যটক কেন্দ্রগুলো ঘিরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে। এখন শুধু প্রয়োজন সড়ক যোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর উন্নয়ন।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদরের সামনেই নির্মিত হয়েছে ‘হাওর বিলাস’সহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা। আর এতে এই জনপদের আকর্ষণ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ‘হাওর বিলাসে‘র উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিছবাহ। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিউর রহমান জাবিত ইত্তেফাককে বলেন, হাওর বিলাস নির্মাণ করা হয় মানুষের প্রশান্তির জন্য। এতে ব্যয় হয় ১৬ লাখ টাকা। এছাড়া ‘পাহাড় বিলাস’, ‘বোয়াল চত্বর’সহ আরো কয়েকটি পর্যটন স্পট তৈরি করা হয়েছে। তিনি জানান, আরো কিছু স্পট বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। নির্বাহী অফিসার বলেন, এতে সুস্থ বিনোদনসহ নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলবে। স্টিলের অবকাঠামো দিয়ে নির্মিত পর্যটকদের অবকাশ যাপনের আয়োজনটি দৃষ্টিনন্দন। মূলত খরচার হাওরের টইটম্বুর জলরাশি, নৌকা ভ্রমণ, নিকটবর্তী খাসিয়া পাহাড় আর আকাশের নানা রূপ এই পর্যটনকেন্দ্রের মূল আকর্ষণ।

অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী জামালগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত হাওর এবং এর পাশে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি পর্যটন স্পটও সবাইকে আকৃষ্ট করে।

হাওরে মানতে হবে ১০ নির্দেশনা:

তাহিরপুরের নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান কবির, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ অন্যান্য পর্যটন স্পটে পর্যটকদের জন্য ১০টি নির্দেশনা জারি করেছেন। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে: করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, নৌ-দুর্ঘটনা রোধে লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে রাখতে হবে, হাওর কিংবা নদীতে যাত্রা শুরুর অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে নির্ধারিত ফরমে তাহিরপুর থানা ও উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নৌযানের নাম, পর্যটকের সংখ্যা, যাত্রা ও ফেরার সময় উল্লেখসহ লিখিতভাবে অবহিত করতে হবে। এছাড়া নৌযানে অতিরিক্ত পর্যটক পরিবহন করা, আবহাওয়া খারাপ থাকলে হাওরে চলাচল করা, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা, উচ্চ শব্দের সাউন্ড বক্স ব্যবহার করা যাবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here