শহীদ মিনার কী জানে না শিশুরা!ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা পাঠ্যপুস্তকেই সীমাবদ্ধ

ঠাকুরগাঁও-ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা কচুবাড়ি উপরপরী হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া আকতার। তার কাছে শহীদ মিনার মানে জাতীয় পতাকা। প্রতিদিন অ্যাসেম্বলিতে জাতীয় পতাকায় সম্মান জানানোটাই তার কাছে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো।
তানিয়ার মতো জেলার বেশিরভাগ স্কুলের শিক্ষার্থীর কাছে শহীদ মিনারের ধারণা এমনই। কারণ ঠাকুরগাঁওয়ে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট নয় শহীদ মিনার বা ভাষা দিবসের তাৎপর্য। ফেব্রুয়ারি এলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চলে ব্যাপক প্রস্তুতি। দিবসটি চলে গেলে আর খোঁজ থাকে না কারও।
কচুবাড়ি উপরপরী হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুক্তা সেন বলেন, ‘স্কুলে স্থায়ী শহীদ মিনার না থাকায় অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। স্কুলে যদি শহীদ মিনার থাকতো তাহলে এ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়তো। এ উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।’
অভিভাবকরা বলছেন, শিশুরা জানে না শহীদ দিবসের মর্মবাণী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারের বরাদ্দ নেই। তাই জেলার অধিকাংশ স্কুলে নেই শহীদ মিনার। ফলে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস জানতে শিশুদের আগ্রহ কম।

রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পেরিয়েছে ৬৯ বছর। অথচ নওগাঁর এক তৃতীয়াংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার। এতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস, গুরুত্ব ও ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।
জেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলায় এক হাজার ৩৭৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এরমধ্যে শহীদ মিনার আছে মাত্র ২০৩টিতে। শহীদ মিনার নেই- নওগাঁ সদরে ১২৪টি, বদলগাছী ১০৩টি, মহাদেবপুর ৯৫টি, মান্দা ১২৮টি, নিয়ামতপুর ১২৫টি, পোরশা ৮৭টি, সাপাহার ৯৩টি, পত্নীতলায় ১৩১টি, ধামইরহাট ৭৮টি, রানীনগর ৮৬টি এবং আত্রাইয়ে ১২১টি বিদ্যালয়ে।
অপরদিকে জেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি মোট ৯২৫টি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে ৪৫৫টিতে শহীদ মিনার নেই। যার অধিকাংশ মাদরাসা।
jagonews24
শিক্ষার মানোয়ন্ননে সরকার প্রতি বছরই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও ভবনসহ অবকাঠামো তৈরিতে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনার নির্মাণে কোনো বরাদ্দ দেয়া হয় না।
ভাষার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠিত করেছে। অথচ সেসব ভাষা শহীদদের স্মরণ করার জন্য নেই শহীদ মিনার। ভাষা শহীদদের নাম পাঠ্যপুস্তকের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। শহীদ মিনার না থাকায় ভাষা শহীদদের স্মরণ ও শ্রদ্ধায় ফুল নিবেদন থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে শিক্ষার্থীরা।
তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে নিজেদের উদ্যোগে কলাগাছ পুঁতে, বাঁশ, কাঠ, কাদামাটি ও কাগজ দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি করে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্বীকৃতি পেলেও এর ইতিহাস ও গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা নেয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকা আবশ্যক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নওগাঁ সদর উপজেলার দোগাছী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৮৮৯ সালে, পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৯৪২ সালে এবং মান্দা উপজেলার শ্রীরামপুর-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও নেই শহীদ মিনার।
jagonews24
পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, পাঠ্য বইয়ে শহীদ মিনার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেয়া হয়ে থাকে। ২১শে ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়ে কাদামাটি দিয়ে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার তৈরি করে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
প্রতি বছরই বিদ্যালয়ের ছোটখাটো সংস্কারের ব্যাপারে বরাদ্দ আসে। কিন্তু শহীদ মিনার নির্মাণে কোনো বরাদ্দ আসে না। তাই ইচ্ছা থাকলেও আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের সভাপতি বিশ্বেস্বর সরকার বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়েই শহীদ মিনার থাকা উচিত। আমাদের বিদ্যালয়ে দীর্ঘ বছর থেকে কোনো শহীদ মিনার নেই। এছাড়া শহীদ মিনার নির্মাণে কোনো ধরনের বরাদ্দ আসে না। বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো ফান্ডও নেই। ইতোপূর্বে শহীদ মিনার নির্মাণে আলোচনাও হয়েছে।
দোগাছী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিউলি ফেরদৌসি আক্তার বলেন, ২১শে ফেব্রুয়ারির আগের দিন শিক্ষার্থীরা কাদামাটি ও ইট দিয়ে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার তৈরি করে। সকাল সকাল বাচ্চারা স্কুলে আসে। তাদের সঙ্গে আমরাও শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তবে স্থায়ীভাবে একটা শহীদ মিনারের প্রয়োজন।

রানীংশকৈল কাদিহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ না থাকায় শহীদ মিনার নির্মাণ করা স্কুল পরিচালনা কমিটির জন্য সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শিশুদের জানাতে শহীদ মিনারের বিকল্প নেই। আমার বিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার তৈরি করে দিবসটি পালন করি।’
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা মটরা হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহা আলম বলেন, ‘শিশুরা জানে না ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এসব দিবস এলে তা পালন করা হয়, এরপর সারাবছর আর খোঁজ থাকে না। ভাষা সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস জানতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার স্থাপন জরুরি।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সূত্রে জানা গেছে, জেলা বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার রয়েছে। তবে সেগুলো বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয়দের উদ্যোগে স্থাপিত। আবার কোথাও কোথাও নির্মাণধীন রয়েছে। সরকারিভাবে বরাদ্দ না থাকায় ধীর গতিতে চলছে এসবের কার্যক্রম।
সদর উপজেলার নারগুন কহরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, সরকারি সহযোগিতা না থাকায় স্থানীয় উদ্যোগে শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, ‘প্রত্যেক বিদ্যালয়ে জাতীয় দিবস পালন করা হয়। সব বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার স্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে তৈরিও হয়েছে, বাকিগুলোয় চলতি বছরেই নির্মাণ হবে।’