শর্তসাপেক্ষে খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রার সবুজ সংকেত, প্রস্তুতি চলছে

রাজনৈতিক বিশ্লেষক । গত ২৬ মার্চ শর্ত সাপেক্ষে মুক্তির পরও বসে নেই খালেদার পরিবার। সমঝোতার যে সূত্রে তার প্যারোলে মুক্তি হয়েছিল, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দেশের বাইরে নিতে সরকারের সেই সূত্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। এরই মধ্যে একবার বৈঠকও হয়েছে দুপক্ষের। কিন্তু দুপক্ষের কেউই এসব নিয়ে মুখ খুলছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েই করোনার অজুহাতে দেশের কোনো হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করানো হয়নি।
লন্ডন পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু : অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের জন্য সরকার ও পরিবারের সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপিপ্রধানকে লন্ডন পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার ভাই শামীম এসকান্দার ব্রিটিশ হাইকমিশনে নিজের এবং বোন খালেদা জিয়ার পাসপোর্টসহ কাগজ পত্র জমা দিয়েছেন। এর আগে ক‚টনৈতিক মহলও এ নিয়ে বেশ উদ্যোগী হয়। সরকার অনুমতি দিলে ব্রিটিশ হাইকমিশন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য ভিসা দেয়ার ঘোষণা দেয়। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট ডিকসন বলেছিলেন, সরকার অনুমতি দিলে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য তারা ব্রিটেন যেতে ভিসা দেবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে ২টি শর্ত : সরাসরি রাজনীতি থেকে অবসরের কথা না বললেও খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যেতে সরকারের পক্ষ থেকে ২টি শর্তের কথা জানানো হয়েছে। প্রথমত, লন্ডনে গিয়েও চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারবেন না। গুলশানে যেভাবে বাস করছেন লন্ডনেও ঠিক তেমনি থাকবেন। দ্বিতীয়ত, বিদেশিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ থেকে বিরত থাকবেন। লন্ডনে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া ও সভা-সমাবেশে যোগদান থেকে বিরত থাকা এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে খালেদার পরিবার চায় শর্ত মেনেই চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাবেন তিনি। তবে খালেদা চান শর্ত ছাড়াই লন্ডন যেতে।
জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম বলেন, জামিনের পর তিনি এখনো পর্যন্ত কোনো শর্ত ভঙ্গ করেননি। তাই এ ব্যাপারে সরকার কঠোর হবে না। তার বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এখনো তেমন উন্নতি হয়নি। চলাফেরাও করতে পারছেন না। মুক্তির মেয়াদ বাড়াতে আবেদন তো করতেই হবে। তবে কখন করব সে ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
শরীরের সর্বশেষ অবস্থা : খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে পুরনো অস্টিও আর্থাইটিস, ডায়াবেটিসসহ অন্য সব রোগই আগের চেয়ে বেড়েছে। একা চলাফেরা করতে পারেন না। জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা কমেনি। বাসায় দুজন নার্স স্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে। তারা বাসায় থেকেই তার স্বাস্থ্যের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন এবং ফিজিওথেরাপি দিচ্ছেন। এ ছাড়া তার মেরুদণ্ড, বাম হাত ও ঘাড়ের দিকে শক্ত হয়ে যায়। দুই হাঁটু প্রতিস্থাপন করা আছে। তিনি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ খান। বাম চোখেও বেশ সমস্যা রয়েছে তার। চিকিৎসা সার্বিকভাবে তদারকি করছেন তার পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমান।
ফিরোজায় যেভাবে কাটে দিন : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালেদা জিয়া নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন ও কুরআন তিলাওয়াত করেন। পত্রিকা পড়েন ও টিভির খবর দেখেন। লন্ডনের নাতনিদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। বিকালে চেয়ার পেতে বারান্দায় বসে থাকেন। ডায়াবেটিস থাকায় সতর্কভাবে খাবার খাচ্ছেন তিনি। স্যুপ, সবজি-রুটি, মুরগি, লাউ ও মাছের ঝোলের তরকারি ও সরু চালের ভাত ও পোলাও খান তিনি। বাসায় পুরনো বাবুর্চিরাই রয়েছেন। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বাসা থেকে রান্না করেও খাবার নিয়ে আসেন। প্রয়োজনে দলের কাউকে ডেকে পাঠান বিএনপিপ্রধান নিজেই। তবে মেডিকেল টিম যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। প্রতিদিনই একজন চিকিৎসক ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলও যান মাঝেমধ্যে। ওষুধ খেয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন তিনি। এখন নিয়মিত ডায়াবেটিসের মাত্রা ৮ থেকে ১৪র মধ্যে ওঠানামা করে।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের সিনিয়র সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা আগের মতোই। ডায়াবেটিস এখনো ওঠানামা করে। আগে জয়েন্টে জয়েন্টে যে ব্যথা ছিল সেগুলো এখনো আছে। তিনি আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ম্যাডামের মুক্তির জন্য আমরা আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দেশে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায় তার কারামুক্তিতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচির মাধ্যমেই আমরা এই দাবি আদায় করে ছাড়ব।