লক্ষীপুরে একজন শারীরীক প্রতিবন্ধীর সংস্কৃতি চর্চা ও বিবর্ণ আলাপ

অ আ আবীর আকাশ | লক্ষ্মীপুর

আজকে যারা লক্ষ্মীপুর জেলা ও জেলার বাহিরে সংস্কৃতি অঙ্গনে কম বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন তাদের অনেকেই মহিউদ্দিন রতনের ‘শতাব্দি শিল্পী গোষ্ঠী’র ছায়ায় তৈরি হয়েছেন। নতুন কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেও খোঁজ নিয়ে জানা যাবে, তারা যাদের ওস্তাদ বলে গণ্য করে আসছেন তারাও শতাব্দি শিল্পী গোষ্ঠীর সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত ছিলেন। সেখান থেকে শিখেছেন, জেনেছেন, বুঝেছেন, তৈরি হয়েছেন।

আজকের লক্ষ্মীপুরে যে ক’জন সংস্কৃতির সমজদার বলে বিবেচিত, তারা অহিদ উদ্দিন রতনের থানা রোডস্থ ইকবাল রেকর্ডিং হাউজে না গেলে শতাব্দি শিল্পী গোষ্ঠীতে না গেলে সংস্কৃতিবোদ্ধা হতে পারতেন না। সবাই সামনের দিকে এগিয়ে গেলেও ডার্কে রয়ে গেছেন নিরলস শ্রম, সাধনা, ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান মানুষ উদ্দিন রতন। কিন্তু কে এই রতন?

অহিদ উদ্দিন রতন শারীরিক অক্ষমতা নিয়েও সংস্কৃতিচর্চা করে চলেছেন আজীবন। তিনি ১৯৫৮ সালের ৫ জুলাই জেলা সদরের শাকচর ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৃত সুলতান আহমেদ, মাতা অহিদা খাতুন।বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী, ফুটবলপ্রেমী। মা ছিলেন গৃহিণী। তার জন্মের পর পোলিও হওয়ার দরুন একপা বিকলাঙ্গ হওয়ায় তার শারীরিক অক্ষমতা চলে আসে।

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে ভর্তি হন লক্ষ্মীপুর মডেল হাইস্কুলে। সেখানে তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৭৮ সালে ভর্তি হন কুমিল্লা টেকনিক্যাল স্কুলে, সেখানে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮১ সালে লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের থানা রোডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইকবাল রেডিও হাউস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে তিনি শব্দযন্ত্র ভাড়া, অডিও ক্যাসেট বিক্রি, ইলেকট্রিক ডিভাইস এবং সেখানে আলাদা একটি কক্ষ রেখেছেন সংগীতার জন্য। একদিকে জীবিকা নির্বাহ অন্যদিকে শিল্পচর্চা।

১৯৭৬ সালে মডেল হাই স্কুলে পড়ার সময় সেখানে তার শিক্ষাজীবন তৈরি হয় সংগীতের প্রতি অনুরাগ। তখনকার মডেল হাই স্কুলের বাংলা শিক্ষক জালাল উদ্দিন স্যার গান করতেন। সেই শিক্ষকের কাছ থেকে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়ে হাতে খড়ি নেন। তারপর সদ্যপ্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্দুল মতিন সাহেবের কাছে শুরু হয় নিয়মিত সংগীত শিক্ষা গ্রহণ ও চর্চা। এরপর নোয়াখালী জেলা শহর থেকে আসতেন খলিলুর রহমান তার থেকে নিয়েছেন শিক্ষা। ১৯৮৭-৮৮ সালে ওস্তাদ মাহবুবুল বাসারের কাছে সংগীত বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করেন। একদিকে শিখছেন অনযদিকে চালিয়েছেন সঙ্গীতচর্চা। এখানেই থেমে যাননি তিনি, ১৯৯২ সালে ঢাকার স্বরলিপি স্টুডিওর স্বত্বাধিকারী এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের গুনীজনরা শিল্পী ইফতেখার হোসেন সোহেলের কাছ থেকে কীবোর্ড বাজানো শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনিও ছিলেন একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী।

অহিদ উদ্দিন রতন এর সংগীত কক্ষে জেলা শহরে যারা সংস্কৃতি চর্চা করতেন তাদের প্রায় সকলেই পদচারণা ছিল। সেখানে তাদের মধ্যে নাট্যব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মাইনুদ্দিন পাঠান, শংকর মজুমদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মাখনলাল ভৌমিক,গাজী গিয়াসউদ্দিন, টিংকু রঞ্জন মল্লিক, অমল কুমার দাস, মাহতাব উদ্দিন আরজু, মোস্তফা মাতব্বর, হোসেন বয়াতি, আমীন বয়াতিসহ অন্যান্য ব্যক্তিগণ।

১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লক্ষীপুর প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা’। সেখান থেকে তিনি প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন ও পরিচালনা করেন। ২০০৫ সালে তিনি সেখানকার মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকার উত্তরার দক্ষিণখানে অবস্থিত প্রতিবন্ধী কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৯০ সালে প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের গণসচেতনতা কার্যক্রমের আওতায় গ্রামপর্যায়ে শিক্ষা ও গণজাগরণমূলক অনুষ্ঠান করেন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শতাব্দি শিল্পী গোষ্ঠী’। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংগঠন থেকে ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম উদযাপিত জাতীয় বৃক্ষমেলা ও দিবসগুলোতে অনুষ্ঠান করেছেন। এছাড়া প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করতে এবং কিবোর্ড বাজাতেন।

অহিদ উদ্দিন রতন এ পর্যন্ত প্রায় ৫০-৬০টি গানের গীতিকার ও সুরকার দিয়েছেন। এছাড়া অন্য গীতিকারদের লেখা গানেরও সুর করেছেন।

জেলার বয়াতি বাউল শিল্পীদের সাথে যোগাযোগ ছিল তার। সেভাবেই জেলা সদরের হোসেন বয়াতির গাওয়া দুইটি ক্যাসেট বের করতে ক্লান্ত পরিশ্রম করেন। তার মধ্যে একটি ‘কলিকালের গান’ শিরোনামে অন্যটি ‘মজিদ মালতীর কাহিনী’ শিরোনামের অডিও অ্যালবাম দুইটি সামাদ ইলেকট্রনিক্স পাটুয়াটুলী ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

অহিদ উদ্দিন রতন তার ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে অডিও সংগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। একটি নতুন জেলা সদরে এমন সংগ্রহ চোখে পড়ে না। তার শব্দ প্রক্ষেপণ ও নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা আছে অসাধারণ। সে অভিজ্ঞতায় তিনি বিভিন্ন যাত্রাপালা ও নাটকে আবহসংগীতের কাজ করতেন। তাছাড়া প্রয়াত ও বেলায়েত হোসেন রিপন ও টিংকু রঞ্জন মল্লিক নতুন নাটকের কাজ নিলে তার ইকবাল রেডিও হাউজ থেকে আবহাওয়া সংগীতের কাজ করতেন।

১৯৮১সালে বিয়ে করেন। স্ত্রী তখন থেকেই তাঁর সঙ্গী। বর্তমানে তিনি তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক।

প্রযুক্তির পরিবর্তিত অবস্থায় এগিয়ে যাবার সাথে আর্থিক অসঙ্গতির কারণে তিনি তার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে পারেননি। পড়ে আছেন পিছনে। ভুক্তে হচ্ছে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মত জটিল ব্যাধিতে। জেলার কোন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ গুনী শিল্পীকে সম্মান জানাতে পারেনি। পাচ্ছেন না সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে অসচ্ছল সংস্কৃতিসেবীদের মাসিক কল্যাণভাতা। সরকারিভাবে পাননি কোনো অসচ্ছল সংস্কৃতিসেবী ভাতা। সে বিষয়ে কোনো অভিযোগ না করেই চালিয়ে যাচ্ছেন জীবনতরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here