ইউক্রেনের যেসব অঞ্চল রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও রাশিয়ার সেনাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সেখানে গণভোট আয়োজনের তোড়জোড় চলছে। ইউক্রেনের খেরসন, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যেই এ গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।

খেরসন অঞ্চলে রাশিয়ার নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তারা গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে খেরসনকে যুক্ত করা নিয়ে তাঁরা গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খেরসনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর নেতাদের সুরেই কথা বলেছেন রুশ পার্লামেন্টের স্পিকার। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে যদি জনগণ ভোট দেন, তবে তিনি তাতে সমর্থন করবেন।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একজন বলেছেন, তিনিও মস্কো-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবকে সমর্থন করছেন। এতে ইউক্রেনের বিশাল অঞ্চল ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। এতে কিয়েভকে সমর্থনকারী পশ্চিমাদের ওপরেও চাপ বাড়বে।

এদিকে গণভোট আয়োজন নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রসঙ্গে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে গণভোটের আয়োজন হবে কি না, এ সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলের লোকজনের। শুরু থেকেই আমরা বলে আসছি, ওই সব এলাকার লোকজনের ভাগ্য তাঁদের নিজেদের নির্ধারণ করতে হবে।’

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সাত মাসে গড়িয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন পুতিন। তবে মস্কো একে ‘সামরিক অভিযান’ বলে উল্লেখ করে থাকে। গত সাত মাসের যুদ্ধে ইউক্রেনের এক-পঞ্চমাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন রাশিয়ার সেনারা। তবে ইউক্রেনের সেনারা এখন পাল্টাহামলা শুরু করেছেন। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের সেনাদের কাছে কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন রাশিয়ার সেনারা। এ পরিস্থিতিতে পুতিন এখন যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। এর মধ্যেই গত সোমবার দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা রাশিয়ায় যোগদানের জন্য গণভোটের পরিকল্পনায় সম্মতি দেন।

২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রুশ প্রেসিডেন্টের পদে ছিলেন দিমিত্রি মেদভেদেভ। তিনি এখন রুশ নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, খেরসন, লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের মতো এলাকায় গণভোট রাশিয়ার ইতিহাসের পথ বদলে দেবে। গণভোটের ফলে এসব এলাকা রাশিয়ার ভূখণ্ডে পরিণত হবে। এতে ক্রেমলিনের জন্য নিজস্ব ভূখণ্ড প্রতিরক্ষার আরও সুযোগ তৈরি হবে।

টেলিগ্রাম অ্যাপে করা এক পোস্টে মেদভেদেভ বলেন, রাশিয়ান ভূখণ্ডে সীমালঙ্ঘন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এতে রাশিয়ার পক্ষ থেকে আত্মরক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করা সম্ভব হবে। এ কারণেই এ ধরনের গণভোটকে কিয়েভ ও পশ্চিমারা এত ভয় পায়।

মেদভেদেভ আরও বলেন, রাষ্ট্রের সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও এটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভবিষ্যতে রাশিয়ার কোনো নেতা বা কোনো কর্মকর্তা এ ধরনের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে পারবেন না। তিনি বলেন, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক নিয়ে গঠিত দনবাস ও অন্য মুক্ত অঞ্চলের লোকজনকে সুরক্ষা দিতেই গণভোট গুরুত্বপূর্ণ।

পুতিন যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেনের বিশাল এলাকা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবেন তিনি। এর আগে গত মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সতর্ক করে বলেন, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সংঘাতের অর্থ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বাইডেন ও ন্যাটো নেতৃত্ব এর আগে বলেছেন, তাঁরা সরাসরি রাশিয়ার সেনাদের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়াতে চান না। তবে পুতিন ও রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছেন, পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনে ছায়াযুদ্ধ করছে। তারা ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

গত শুক্রবার পুতিন ইউক্রেনের পাল্টাহামলাকে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনে তাঁরা মূলত প্রতিরোধযুদ্ধ করছেন। রাশিয়াকে ধ্বংস করার পশ্চিমা চক্রান্ত রুখতে এ সংঘাত চলছে।

এদিকে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের ভূখণ্ড থেকে রাশিয়ার সব সেনা না সরে যাওয়া পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবে। তাদের অঞ্চলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ কখনোই মেনে নেবে না। রাশিয়ার সেনাদের রুখতে পশ্চিমাদের কাছে আরও উন্নত অস্ত্র চেয়েছে কিয়েভ।

তবে এ যুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আহ্বান করা গণভোট কীভাবে কাজ করবে, তা পরিষ্কার নয়। রাশিয়ার সেনা ও তাঁদের সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দোনেৎস্কের ৬০ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছেন। এ ছাড়া ইউক্রেনের সেনারা লুহানস্ক দখলমুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাশিয়ার সেনারা অবশ্য যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই লুহানস্কের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন। গত সোমবার ইউক্রেনের সেনারা পাল্টাহামলা চালিয়ে লুহানস্কের বড় একটি গ্রাম মুক্ত করার দাবি করেছেন। দোনেৎস্কের এখনো অনেক বড় অঞ্চল ইউক্রেনের সেনাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। এ ছাড়া খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়াতেও ইউক্রেনীয় সেনাদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আছে।