কেক ছাড়া কি বিলেতে জন্মদিন হয়? মোটেই না। আর সেই জন্মদিন যদি হয় ব্রিটেনের রানির, তাহলে কেক কেবল অন্যতম অনুষঙ্গই নয়, সেই কেক কে বানালেন তাও এক বিশাল ব্যাপার বটে। তাই তো হুলুস্থুল পড়ে যায় নাদিয়াকে নিয়ে।

২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল মহা ধুমধামে পালিত হয় ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ৯০তম জন্মদিন। সেই জন্মদিনের কেক বানান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাদিয়া। হ্যাঁ, পুরো নাম নাদিয়া হোসেন। ২০১৫ সালে বিবিসির রান্না-বিষয়ক জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা ‘গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ শিরোপা জিতে যিনি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন। রানির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবেই নাদিয়াকে জন্মদিনের কেক বানানোর অনুরোধ করা হয়। নাদিয়া ‘উইন্ডসর ক্যাসল’-এ গিয়ে রানির হাতে পৌঁছে দেন সেই কেক। সৃষ্টি হয় নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশিদের গৌরবের তালিকায় যুক্ত হয় আরও একটি নতুন পালক।

৯০তম, তাই রানির জন্মদিন নিয়ে সেবার বেশ আগে থেকেই মাতামাতি চলছিল। বাকিংহাম প্রাসাদের বাসিন্দা রানি লন্ডনের কাছের সুবিশাল ‘উইন্ডসর ক্যাসল’-্এর গিল্ড হলে নিজের জন্মদিন পালন করেন। প্রায় এক হাজার বছর ধরে ‘উইন্ডসর ক্যাসল’ ব্রিটিশ রাজপরিবারের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

লুটন শহরে জন্ম নেওয়া নাদিয়ার পৈতৃক বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারের মোহাম্মদপুর গ্রামে। বাবা জমির আলী ব্রিটেনে আসেন ১৯৭০ সালে। জমির ও আসমা দম্পতির চার মেয়ে, দুই ছেলের মধ্যে নাদিয়া তৃতীয়। স্বামী আবদাল হোসেন ও তিন সন্তানকে নিয়ে লন্ডনের অদূরে মিলটনকিনস শহরে নাদিয়ার বর্তমান বাস।উচ্ছ্বসিত নাদিয়া বলেন, ‘এটা রীতিমতো স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার মতো।’ রানির জন্মদিনের কেক বানাতে পেরে বেশ সম্মানিত বোধ করেন নাদিয়া।

যেভাবে রানির অনুরোধ এল

মাস দুয়েক আগে নাদিয়ার কাছে একটি ই-মেইল পাঠিয়ে বলা হয়, ‘রানির পক্ষ থেকে আপনাকে তাঁর ৯০তম জন্মদিনের কেক বানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। আপনি পারবেন কি না?’ নাদিয়া ভাবলেন, কেউ হয়তো মজা করছে। বিষয়টি তিনি তাঁর এজেন্ট অ্যান কিবেলের কাছে জানতে চান। অ্যান বললেন, ঘটনা সত্যি। চোখ যেন কপালে উঠল নাদিয়ার। খানিকটা স্নায়ুচাপ সত্ত্বেও মনে মনে বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই পারব।’ পরে বাকিংহাম প্রাসাদের কর্মকর্তারা টেলিফোনে নাদিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নাদিয়া বলেন, ‘আমার না করে দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু রানিকে কি কখনো না বলা যায়?’

কেমন ছিল এই কেক

কী ধরনের কেক বানাবেন তা নিয়ে রীতিমতো ভাবনায় পড়ে যান নাদিয়া। গুগল ঘেঁটে দেখে নেন আগের বছরগুলোতে রানির জন্মদিনের কেক কেমন ছিল। সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল ফ্রুট কেক (বিভিন্ন ফলের স্বাদে তৈরি কেক)। বাকিংহাম প্রাসাদ থেকেও বলা হলো, চাইলে তিনি ফ্রুট কেক বানিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু নাদিয়া ভিন্ন কিছু করতে চাইলেন। জানালেন, তিনি ‘অরেঞ্জ ড্রিজল’ (কমলার স্বাদে তৈরি ঝুরঝুরে কেক) বানাতে চান। আপত্তি করল না বাকিংহাম।

নাদিয়া জানান, অরেঞ্জ ক্রিম দিয়ে তৈরি করেছেন এই কেক। প্রলেপ দিয়েছেন কমলা মাখনের (অরেঞ্জ বাটারক্রিম)। স্বাদ-গন্ধ কিছুটা লেবুর মতো।

নাদিয়ার ব্যস্ততা

২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর ‘গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ প্রতিযোগিতার শিরোপা জয় করেন নাদিয়া। সেই শিরোপা নাদিয়ার সাফল্যের ঝুড়িতে যোগ করে আরও অনেক কিছু। আইটিভির ‘লুস উইমেন’ অনুষ্ঠানে নাদিয়া প্রায় নিয়মিত অতিথি। দ্য টাইমস এবং এসেনশিয়াল-এ নিয়মিত কলাম লিখছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন টিভি-রেডিওর অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি তো আছেই। রানির জন্মদিনের কেক বানানোর গৌরব যে নাদিয়ার অর্জনের ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই অর্জনে গৌরবান্বিত হবে বাংলাদেশিরাও। কেননা নাদিয়ার সাফল্যের গল্প নিয়ে যত আলোচনা আর খবর হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের নামটাও যে উজ্জ্বল হয়ে উঠে আসছে বারবার।