রোহিঙ্গা শিপ্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার আজিজুল হকসহ অপর তিনজন মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন। হামলায় আজিজুলসহ ১৯ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাঁচজনের হাতে অস্ত্র ছিল। গ্রেপ্তার চার রোহিঙ্গাকে গতকাল দুপুরে উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আরও পাঁচজন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করে এপিবিএন। এ নিয়ে মুহিবুল্লাহ হত্যা মামলার মোট ৯ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁদের সবাই রোহিঙ্গা।

পুলিশ জানায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের কার্যালয়ে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হন সংগঠনটির চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ (৪৮)। পরদিন মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন।

মুহিবুল্লাহকে খুনের মামলায় আগে প্রেপ্তার পাঁচ রোহিঙ্গাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে উখিয়া থানার পুলিশ। তাঁদের একজন মোহাম্মদ ইলিয়াছ কক্সবাজার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

মুহিবুল্লাহকে খুনের পরিকল্পনা

গতকাল বেলা সোয়া একটার দিকে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে এপিবিএন কার্যালয়ে মুহিবুল্লাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চারজনের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত উল্লেখ করে নাঈমুল হক বলেন, গ্রেপ্তার আজিজুল হক ছিলেন মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ‘কিলিং স্কোয়াডে’র অন্যতম সদস্য। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পরে ক্যাম্পের বিভিন্ন আস্তানা থেকে অপর তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানায়, মুহিবুল্লাহকে হত্যার দুই দিন আগে ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে লম্বাশিয়া মরকজ পাহাড়ে একটি সভা হয়। সভায় আজিজুল হকসহ আরও চারজন অংশ নেন। দুর্বৃত্তদের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মুহিবুল্লাহকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন মর্মে সভায় আলোচনা করা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত ভূমিকা পালন করে মুহিবুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে উঠেছেন। তাঁকে থামাতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৯ সেপ্টেম্বর এশার নামাজের পর হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

পুলিশ সুপার নাঈমুল হক বলেন, এশারের নামাজের পর প্রত্যাবাসন বিষয়ে কথা আছে বলে মুহিবুল্লাহকে ডেকে নিয়ে যান গ্রেপ্তার মুরশিদ আমিন। এরপর সেখানে পৌঁছান মো. আনাছ ও নুর মোহাম্মদ। তাঁরা মুহিবুল্লাহকে হত্যার জন্য দুর্বৃত্তদের ঘটনাস্থলে আসার সংকেত দেন। এ সময় মুখোশধারী সাতজনের মধ্যে তিনজন অস্ত্রধারী মুহিবুল্লাহর অফিসকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করেন। অফিসের দরজায় অবস্থান নেন অস্ত্রধারী মো. আনাছ, নুর মোহাম্মদ, আজিজুল হক ও অপর একজন। মুহিবুল্লাহ তখন ১০-১৫ জন সঙ্গীসহ অফিসের ভেতরে ছিলেন। অস্ত্রধারীদের তিনজনের একজন মুহিবুল্লাহর কাছে গিয়ে বলেন, ‘মুহিবুল্লাহ, ওঠ’। মুহিবুল্লাহ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালে প্রথম একজন একটি গুলি ছোড়ে। গুলিটি মুহিবুল্লাহর বুকে লাগে। এরপর আরেকজন দুটি গুলি ছোড়ে। এরপর আরও একটি গুলি ছোড়া হয়। মুহূর্তে মুহিবুল্লাহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আরও বলেন, মুহিবুল্লাহকে গুলি করার পর আজিজুল হক, মো. আনাছ ও নুর মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহর অফিসসংলগ্ন পেছনের রাস্তা দিয়ে পেঁপেবাগান হয়ে পালিয়ে যান। মুহিবুল্লাহ কিলিং স্কোয়াডে ১৯ জন ছিল, এর মধ্যে পাঁচজন ছিল অস্ত্রধারী।

শুক্রবার থেকে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন এপিবিএন প্রধান ও ডিআইজি আজাদ মিয়া। মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিআইজি আজাদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিল, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। গতকাল চারজনসহ মুহিবুল্লাহ হত্যা মামলার এ পর্যন্ত ৯ জন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পরিস্থিতি থমথমে, শঙ্কায় রোহিঙ্গারা

উখিয়ায় থাইনখালী আশ্রয়শিবিরে মাদ্রাসায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে ছয়জন নিহত হওয়ার পর গতকাল সকাল ১০টায় থাইনখালী শিবিরে গিয়ে দেখা গেছে, সড়ক ও অলিগলিতে চেকপোস্ট বসিয়ে টহল দিচ্ছে পুলিশ। ভেতরে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। এ সময় শিবিরের রাস্তাঘাটগুলো ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ দেখা যায়। ছয় হত্যাকাণ্ডে ১০ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে।

ছয় মাদ্রাসাশিক্ষক-ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবীকে হত্যার পেছনে চারটি কারণ তুলে ধরেছেন রোহিঙ্গা নেতারা।

এগুলো হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা ১৫০টির বেশি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রোহিঙ্গাদের গড়া পৃথক দুটি সংগঠন ‘উলামা কাউন্সিল’ ও ‘ইসলামী মাহাস’ নেতাদের মধ্যে বিরোধ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে-বিপক্ষে মতবিরোধ, মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা নিয়ে দুই সংগঠনের নেতাদের মধ্যে বিরোধ। এর রেশ ধরে মাদ্রাসায় হামলার ঘটনা ঘটেছে।

রোহিঙ্গা নেতাদের ভাষ্য, উলামা কাউন্সিল নিয়ন্ত্রণ করেন আরসা নাম ব্যবহারকারী কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা। এ সংগঠনের সভাপতি রোহিঙ্গা নেতা হাফিজুল্লাহ। তিনি ক্যাম্পের বাইরে থাকেন। অন্যদিকে ইসলামী মাহাসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৌলভি সেলিম উল্লাহ। তিনি থাকেন উখিয়ার বালুখালী শিবিরে।

রোহিঙ্গা নেতাদের ভাষ্য, একসময় সেলিম উল্লাহ আরসার কমান্ডার ছিলেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা, চাঁদাবাজি, মাদক ও সোনা চোরাচালানে যুক্তসহ অপহরণ, ধর্ষণ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় তিনি আরসা ছেড়ে ইসলামী মাহাস গড়ে তোলেন। এরপর আরসার সঙ্গে তাঁর সংগঠনের বিরোধ শুরু হয়। শুক্রবার ভোরে উখিয়ার থাইনখালীর যে মাদ্রাসায় হামলা চালানো হয়, সেটি ইসলামী মাহাস পরিচালিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here