মিয়ানমারের জেনারেলদের হিসাবে কোথায় ভুল হয়েছে?

অং জৌ, দ্য ইরাবতী 
 
 

বড় ধরনের দমনাভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। রোববারের পর থেকেই কঠোর পদক্ষেপের আশঙ্কা করছে জনগণ। এদিন প্রধান শহরগুলোয় মোতায়েন করা সেনা সংখ্যা বাড়ানো হয়। সামরিক যান টহল দিয়েছে ইয়াঙ্গুন, মান্দালয় এবং নেপিদোর মতো বড় নগরে।

রোববার দিবাগত রাত ১টায় ইন্টারনেট সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তখন সেনা অভিযান প্রায় নিশ্চিত বলে ভয় করেছিলেন গণমাধ্যম কর্মীরা। আলোকচিত্রী সাংবাদিকরা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়েও। এসময় আমার এক বন্ধু মোবাইল থেকে স্পর্শকাতর সব তথ্য মুছে ফেলার পরামর্শও দেন।

বন্ধুটি ফোনে প্রায় ফিসফিস করে বলেন, “সব বাতি নেভানো হয়েছে, প্রস্তুত থেকো।”

গণমাধ্যম তথা সাধারণ মানুষের মধ্যে সেনাবাহিনীর অতীত দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়েছে এ ভীতি। আর দেশজুড়ে চলতে থাকা গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ দমনে তারা যে রক্তক্ষয়ের পথ বেঁছে নিতে চলেছে- তা নিয়েও কারো মনে সন্দেহ নেই।

শেষরাত ৪টা নাগাদ বড় ধরনের কোনো সেনা অভিযানের সংবাদ পাওয়া যায়নি। তবে কিছু গ্রেপ্তারের সংবাদ জানা যায়। এরমধ্যে কাচিন রাজ্যের মিতকিনা শহরে পাঁচ সাংবাদিক ও স্থানীয় দুই অধিবাসীকে গ্রেপ্তারের কথা শোনা গেছে। তবে সকালের আলো ফুটতেই ভয় উপেক্ষা করে ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের রাজপথে ফেরে সরকারি আইন অমান্যকারী আন্দোলনকারীরা। রাজধানী নেপিদোতে বিক্ষুদ্ধ জনতা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেয় বর্মী রাজ স্থাপত্যকলার প্রতীক- ‘অ্যাবোড অব কিংস’ এর সামনে। এই স্থানটি যেকোনো প্রকার সভা-সমাবেশ মুক্ত বলেই ভাবা হতো। কিন্তু, এখন সুবর্ন প্রাসাদের চত্বরটি ভর্তি বিক্ষোভকারী এবং সেনা সদস্যদের মুখোমুখি অবস্থানে।

অতীতের সেনা অভ্যুত্থানের মধ্যে যারা বড় হয়েছেন; তাদের কাছে দেশটি জুড়ে চলমান এ আন্দোলনের পরিণতি অবধারিত বলেই মনে হয়েছে। অতীতের দুঃসহ স্মৃতি থেকেই তারা জানেন, শান্তিপূর্ণ অবস্থান ও গণ-আন্দোলন কীভাবে সামরিক জান্তার ক্রোধ ও বিদ্বেষের শিকার হয়েছিল, কিভাবে তা রুপ নিয়েছিল নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের কসাইখানায়।

সামরিক জান্তা তাদের ধৈর্য হারাচ্ছে, আমরা তার লক্ষ্মণ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু, আজকের যুগে লাইভস্ট্রিম সক্ষমতার হাজার হাজার স্মার্টফোনের সামনে ব্যাপক রক্তপাত ঘটানো একটা চ্যালেঞ্জ। দুই সপ্তাহ আগে অভ্যুত্থানের পর থেকে জনগণের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক বেআইনি হামলা ও নিপীড়নের দৃশ্য; এই প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ববাসী দেখেছে সামাজিক মাধ্যমে। তাই অতীতের মতো সেনাবাহিনী যদি এবারো হামলার পরিকল্পনা করে থাকে- তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের গোর খুঁড়বে।

ছবি: দ্য ইরাবতী

তারপরও, গণতন্ত্রপন্থী ও সেনা শাসক পরস্পর বিরোধী অবস্থানের পরিণতি চিন্তা করলে গায়ে কাঁটা দেয়। মনে হচ্ছে যেন, সম্ভাব্য একটি রেল দুর্ঘটনা ‘স্লো-মোশনে’ দেখছি।

গেল নভেম্বরে অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কিছুদিন আগে, এক সহকর্মী দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কাছে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে একটি বার্তা পাঠান। তিনি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা এবং সেনাবাহিনীর একটি অভ্যুত্থান অনুমান করেছিলেন। আমি তখন সেই বিশ্লেষণ নাকচ করে দিলেও- মনে মনে জানতাম অশুভ লক্ষ্মণগুলো স্পষ্ট হচ্ছে।

এরপর নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে শেষ দফার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার খবর যখন জানা গেল, তখন বুঝেছিলাম আমরা অন্ধকার এক সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছি। সেই সহকর্মী এবার বার্তা পাঠালেন; ‘গেম ওভার’ এভাবে তিনি যেন গণতন্ত্রের করুণ পরিণতিকে তুলে ধরলেন।  সত্যিকার অর্থেই আজকের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট গেল নভেম্বরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। মিয়ানমার ছয় মাসের মধ্যেই সংঘাত, রাজনৈতিক বিভাজন এবং অবশেষে সেনা বাহিনীর হস্তক্ষেপের শিকার হবে; সহকর্মীর এমন ভবিষ্যৎ বাণী বাস্তবেই রুপ নিল। ছয় মাস অবশ্য লাগেনি, তার আগেই ক্ষমতা কেড়ে নেয় সেনাবাহিনী।

১৯৮৮ সালের গণ-আন্দোলনের সময়ে সেনা সদস্য ও বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি অবস্থান। ছবি: দ্য ইরাবতী

সেই সহকর্মীটি সঠিকভাবেই ভোট জালিয়াতিকে সেনাবাহিনী প্রধান ইস্যুতে রুপ দেবে বলা আভাস দেন। আর ক্ষমতায় আসার সঙ্গেসঙ্গে জাতিগত সংঘাত, আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে; সেনাবাহিনী উদ্যমী হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধানে সংশোধনী এনে জান্তা সরকার পুনঃনির্বাচন করবে বলেও সেখানে বলা হয়। অবশ্য, এই নির্বাচনে ২০১০ সালের মতোই এনএলডি’কে বাদ দেওয়া হবে। আইন করে নিষিদ্ধ করা হবে অং সান সু চি’র দলটিকে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উ থিন সেইন অন্তর্বর্তী সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন বলে ধারণা করেছিলেন তিনি। শেষ অনুমানটি সত্যি হয়নি। বরং, সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লিয়াং-ই জান্তা সরকারকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

অভ্যুত্থানের সপ্তাহ খানেক আগে প্রভাবশালী কিছু দেশের কুটনীতিক নেপিদো সফরে আসেন। তাদের মধ্যে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর এখন নতুন করে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। আমার বিশ্বাস, তারা অভ্যুত্থানের ব্যাপারে আগে থেকেই জেনেছিলেন, না জানাটাই বরং আশ্চর্যজনক। সেনা জান্তা দেশে-বিদেশে তাদের সহযোগী ও মিত্রদের সঙ্গে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সবুজ সংকেত পেয়েই গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন জেনারেলরা।

গত ২৯ জানুয়ারি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর প্রতি এক বার্তা পাঠান। সেখানে বলা হয়; মিয়ানমারে হঠাৎ করে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলেও; সামরিক বাহিনী তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। সোজা কথায়, অভ্যুত্থান আসছে তার স্পষ্ট সংকেত।

২০১৮ সালে ইয়াঙ্গুনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের একটি ক্যাফেতে প্রাক্তন উ থিন সেইন সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করছিলাম। তিনি আমাকে ১৯৫৮ সালের ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাবধান করেন।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি, ইয়াঙ্গুনে গণতন্ত্রপন্থী একটি সমাবেশ। ছবি: দ্য ইরাবতী

সেবছর অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রিডম লীগ সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে দেশজুড়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।  তারপর, শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী উ নু’র সরকার উৎখাত করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নে উইন। এরপর, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনি ১৯৬০ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন। নির্বাচনে বিজয়ী উ নু’র হাতে তিনি আবারো ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন। কিন্তু, তা ছিল সাময়িক। দু’বছর পর নে উইন আরেক ক্যু’র মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন।

নে উইনের দাবি ছিল তিনি বার্মাকে নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু, তারপরের ২৬ বছরের সেনা শাসনে বিশ্বের অন্যতম দারিদ্র্যপীরিত দেশে পরিণত হয় মিয়ানমার। এরপর ১৯৮৮ সালে দেশব্যাপী আন্দোলনের মুখে আবারো তার উত্তরসূরিদের ক্ষমতা দখলে সহযোগিতা করেন নে উইন।

নতুন প্রজন্মের এই সেনা শাসকেরা ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশকে নির্মমভাবে শাসন করেছে, তারপর একটি লোক দেখানো নির্বাচনের আয়োজন করে। তবে পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মুখে ধীরে ধীরে সংস্কারের পথে হাটতে থাকে জেনারেলরা। নিকট ভবিষ্যতেও একই ঘটনাবলীর সংস্করণ আশঙ্কা করে সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, “গণতন্ত্র জিম্মি করে সেনাবাহিনী বলবে; এখন আলোচনার সময়; কিন্তু, তার জন্যে তুমি কতোটা মূল্য দিতে প্রস্তুত?” এভাবে সেনাবাহিনী দেশের সংবিধানে নিজেদের বর্তমান ক্ষমতার চাইতেও অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।

তবে ঐতিহাসিক এ ব্যাখ্যার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। নে উইন ছিলেন ভিন্ন যুগের স্বৈরশাসক। তাকে নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী প্রতিবাদের ধরন মোকাবিলা করতে হয়নি। ছিল না স্মার্টফোন বা লাইভস্ট্রিমের সুবিধা। রাজপথের পথনাট্য, স্বচ্ছল মধ্যবিত্তদের উপস্থিতি আর তারকাদের অংশগ্রহণ তার আমলে দেখা যায়নি। নে উইনের আমলে প্রতিবাদ ছিল ভিন্নতর, যাকে তিনি নিজের মতো করে সামলেছেন। যেমন; ১৯৬২ সালের জুলাইয়ে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ভবন, তিনি ডিনামাইট দিয়ে ধবংস করে দেন। এতে মারা যায় অগণিত শিক্ষার্থী। এসব বর্বরতা চালিয়েও তিনি ১৯৬৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ পান।

সেদিন বদলে গেছে। চলতি মাসের শুরুতে সংগঠিত অভ্যুত্থানের সঙ্গেসঙ্গেই বাইডেন প্রশাসন গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের তীব্র নিন্দা জানায় এবং সেনা জান্তার কর্মকর্তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘও নিন্দায় যোগ দেয় এবং তারা সরাসরি গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে। সমর্থন দিয়েছে অপসারিত এনএলডি সরকারকে। ইয়াঙ্গুনে চীন ও রাশিয়ার দূতাবাসের সামনে চলছে তুমুল বিক্ষোভ। ১৯৮৮ সালে যারা ছাত্র আন্দোলনে জড়িত ছিলেন; তারা আজকের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় মুগ্ধ। অতীত আন্দোলনের সময় হাজারো প্রাণ ঝড়লেও বিশ্ব মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে এতটা আন্তরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।

এখানেই হিসাবের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছে সামরিক জান্তা। জন-অসন্তোষ দমনে নির্বিচার রক্তপাতের পথে হাঁটলে তাদের কঠিন পরিণতি ভোগ করতেও হতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রকাশ্যেই সে হুমকি দিয়েছে।

 
 

  • লেখক: মিয়ানমারের ইংরেজী গণমাধ্যম দ্য ইরাবতী’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক 
  • সূত্র: দ্য ইরাবতী থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত