মহামারীর অভিঘাত-কভিড প্রভাবিত খাদ্য সংকট মোকাবেলায় করণীয়

গর্ডন ব্রাউন, মার্ক লোকক ।।
 

প্রায় ২৭০ মিলিয়ন মানুষ—যা কিনা জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইতালির জনসংখ্যার সমষ্টির সমান—আজ উপবাস করে দিন কাটানোর মতো অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।  গত ১২ মাসে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী মূলত শিশুরাই এতে বেশি ভুগছে।

আফ্রিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া মিলিয়ে মোট ১১টি দেশের আনুমানিক ১১ মিলিয়ন শিশু—যাদের বয়স পাঁচ বছরের কম—চরম মাত্রায় খাদ্য সংকটের শিকার।  জরুরি সাহায্য পাওয়া না গেলে ২০২২ সালের শেষ নাগাদ এর মধ্যে ১ লাখ ৬৮ হাজার শিশুর মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া নিম্ন আয়ের আরো ৬০টি দেশের মোট প্রায় ৭৩ মিলিয়ন প্রাইমারি স্কুলপড়ুয়া শিশুকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধার মোকাবেলা করতে হবে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগেই যুদ্ধ এবং নানা আঞ্চলিক রাজনৈতিক কারণে খাদ্য সংকট বেড়ে গিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তন একে আরো বাড়িয়ে দেয়।  কিন্তু অতিমারীর পর খাদ্য সংকট এখন একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

এর একটি কারণ হলো কভিড-১৯ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।  অতিমারীর শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ বিলিয়নের বেশিসংখ্যক ছাত্রছাত্রী শ্রেণীকক্ষের বাইরে থেকেছে এবং প্রায় ২০০ মিলিয়ন এখনো স্কুলে ফেরেনি।

পূর্ববর্তী সংকটগুলোর সময় দেখা গেছে, বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তার মধ্যে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম অন্যতম।  এর মধ্যে অনেক নবীন জীবনকে চরম মূল্য দিতে হয়: নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েরা গর্ভধারণ-সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা শিশু জন্মদানের সময় মৃত্যুবরণ করে। সংকটের সময় বিশেষত মেয়েদের শিক্ষা ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এছাড়া অনেক বিদ্যালয়েই গরিব শিক্ষার্থীরা তাদের একবেলা খাবারে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করে।  বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে লাখ লাখ শিশু কেবল তাদের শিক্ষাই নয়, পুষ্টির নিশ্চয়তা থেকেও বঞ্চিত হয়। চলমান সংকটের সময় শিশুরা মোট ৩৯ মিলিয়ন ‘স্কুল মিল’ (বিদ্যালয়ের এক বেলার আহার) হারিয়েছে। নারী ও মেয়েরাই এর মধ্যে প্রধান এবং এর প্রায় ৭০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষুধার ভুক্তভোগী।

মাত্র কয়েক সপ্তাহের আহার বন্ধ হওয়ার কারণে যে পুষ্টিহীনতা সৃষ্টি হবে তা একটি শিশুর জীবনীশক্তি নষ্ট করে দিতে পারে এবং অনেক শিশুর সাথে এমন হওয়ার অর্থ একটি দেশের একটি প্রজন্ম এবং অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাওয়া। সুতরাং বিদ্যালয়ে শিশুদের ফিরিয়ে এনে তাদের শিক্ষা ও খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।

আপেক্ষিকভাবে কম অর্থ নিয়ে হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার অর্জন দৃষ্টান্তমূলক।  উদাহরণস্বরূপ জাতিসংঘ বৈশ্বিক খাদ্য কার্যক্রম বছরে মোটামুটি ১০০ মিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করে। কভিড-১৯ যখন আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কড়াভাবে বন্ধ করল, স্বাস্থ্যকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে সঙ্গেই খাদ্য প্রেরণের জন্য জাতিসংঘ বিশেষ রসদ পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। কিন্তু এই মাত্রার সংকট মোকাবেলায় কেবল ‘স্কুল মিল’ নয়, বরং আরো উচ্চমানের কিংবা বলা যায় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।  মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষে এতকিছু করা সম্ভব হয় না।

বৈশ্বিক খাদ্য চাহিদার এ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায়—গ্রুপ-৭ (জি-৭)-এর পরবর্তী সামিট আলোচনায়— সংস্থার অন্তর্গত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশগুলোর পক্ষ থেকে একটি যৌথ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া উচিত। পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের বিধান রাখতে হবে: খাদ্যের মজুদ তৈরি করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশের কৃষক ও খাদ্য উৎপাদকদের স্বনির্ভর করা।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উন্নয়নের স্বার্থে নীতিনির্ধারকদের উচিত নিশ্চয়তাভিত্তিক সুবিধাদি প্রদান বা বেসরকারি খাতে অর্থায়নের মতো উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নেয়া।  কেননা ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নিশ্চিত করতে আদ্দিস আবাবা প্রস্তাবে আমরা এমনই দেখেছি। জাতিসংঘের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অংশীদারিত্ব-বিষয়ক সম্পর্ক অগ্রাধিকার পেতে পারে। কেননা যথেষ্ট পরিমাণে রসদ সরবরাহ করে স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষমতা এ বৈশ্বিক সংস্থার আছে।

কিন্তু এ সংকটের খুব সহজ ও সাধারণ একটি তাত্ক্ষণিক সমাধান রয়েছে: নতুন আন্তর্জাতিক অর্থ।  অন্তত ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মজুদ সম্পদ) যদি গরিব দেশগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। নেতৃত্ব পর্যায়ের সঙ্গে ঋণদাতাদের একটি চুক্তি হতে পারে যে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা যাবে, যেখানে শর্ত থাকবে এ অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে ব্যবহূত হবে। বিশ্বব্যাংক ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলো এ শর্তে দ্রুত অনুদান ও ঋণ মঞ্জুর করতে পারে।

এ বছর আনুমানিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাধ্যমে ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও সাহিলের দুর্ভিক্ষ ঠেকিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে।  এর দ্বারা কঙ্গো,   আফগানিস্তান, জিম্বাবুয়ে, ইথিওপিয়া এবং অন্যান্য দুর্বল অঞ্চলের গণমানুষের ক্ষুধাও—যা দ্রুতই দুর্ভিক্ষে রূপ নিত—মোকাবেলা করা গেছে।

শুনলে মনে হতে পারে, এ তো অনেক টাকা! কিন্তু বিশ্বের ধনী অর্থনীতির দেশের প্রত্যেক মানুষের কাছ থেকে প্রতি মাসে কেবল ১ ডলার নিলে এ অর্থ জোগাড় করা সম্ভব, যা মূলত সম্পদশালী দেশগুলোর অতিমারী-সংক্রান্ত প্রণোদনার মাত্র ১ শতাংশ।

আমাদের খুব দ্রুত কাজ করা প্রয়োজন।  এর অর্থ হলো বিশ্ব খাদ্য কার্যক্রমের জন্য অনুদান মঞ্জুর করা এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের মতো এনজিওগুলোর দ্বারা ক্ষুধার্ত শিশু ও পরিবারের ক্ষুধা নিবৃত্তি। মাধ্যমিক পর্যায়ে মাত্র ৩১ শতাংশ শরণার্থী শিশু এবং মাত্র ২৭ শতাংশ মেয়েদের নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম—যা ছিন্নমূল, বাস্তুহারা শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করে এবং অল্প সময়েই এক বিলিয়নে উন্নত হয়েছে—থেমে থাকতে পারে না এবং পূর্ণ অর্থায়ন প্রয়োজন। শিক্ষার সঙ্গে আরো কিছু রসদ যোগ করে চরম দারিদ্র্য ও সংকটপূর্ণ দেশের প্রায় ১৩৬ মিলিয়ন শিশুদের আমরা বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে এবং ধরে রাখতে পারি।

কভিড-১৯ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বিভাজন উন্মোচন করেছে: বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলগামী শিশুর বাড়িতে ইন্টারনেট সুবিধা নেই, যা তাদের অনলাইন শিক্ষায় বাধা।  নিম্ন আয়ের দেশে ৫ শতাংশ শিশুর এ সুবিধা আছে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশে এ হার ৯০ শতাংশ। ইউনিসেফ কর্তৃক পরিচালিত বিশ্বকে সংযুক্ত করার কোনো প্রজেক্টের মাধ্যমে এ বিভাজন দূর করা যায়।

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফেরত আনা এবং মেয়েদের ১২ বছর মেয়াদি শিক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য সরকার অঙ্গীকার নিয়েছে।  কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি এ বিষয়টিও জি-৭ সামিটে আলোচিত ও গৃহীত না হলে এ মহৎ উদ্যোগ সফল হবে না।

ব্যক্তি, পরিবার থেকে শুরু করে পুরো দেশের উন্নতির পেছনে শিক্ষার কতটা ভূমিকা, সময় আমাদের তা দেখিয়েছে।  কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য সংকট ধ্বংসাত্মক ফলাফল আনতে পারে: নিদারুণ এবং অনিবার্য মৃত্যু, সহিংসতা ও গণস্থানান্তর।

বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এড়িয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। বিশ্বের অত্যন্ত দুর্বল একটি দেশে যা ঘটে তার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব সবচেয়ে স্থিতিশীল দেশটির ওপরও পড়ে।

বিশ্বের নেতাদের খুব সহজ কিছু কাজ করতে হবে: এখনই খাদ্য সংকট মোকাবেলায় কাজ করা, অন্যথায় পরবর্তী সময়ে চরম মূল্য দেয়া।  একাধিক দুর্ভিক্ষের যাতনা ভোগের পাশাপাশি একটি শিক্ষাবঞ্চিত প্রজন্ম তৈরি করার চেয়ে তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপে পরিস্থিতি মোকাবেলা সহজ এবং অনেক প্রাণও রক্ষা পাবে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট}

গর্ডন ব্রাউন: যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী, বর্তমানে বৈশ্বিক শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিশেষ দূত

এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন ফাইন্যান্সিং গ্লোবাল এডুকেশন’-এর চেয়ারম্যান।

মার্ক লোকক: জাতিসংঘ ‘হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স’-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী

ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান