দেশে বিনিয়োগের বাধা দূর করতে আর্থিক লেনেদেনে পাসপোর্টকে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী।বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো কোনো পদক্ষেপ প্রবাসীদের ‘বিব্রত করছে’ বলে দাবি করেন নিউইয়র্কে আবাসন খাতে বিনিয়োগকারী প্রবাসী আনোয়ার হোসেন।

দীর্ঘদিন পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও দেশপ্রেমের কারণে শুধুমাত্র বাংলাদেশের পাসপোর্ট বহন করছেন তিনি।দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী এই ব্যবসায়ী বলেন, “এবার যখন সোনালী এক্সচেঞ্জে (সোনালী ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান) গেলাম তখন আমাকে জানানো হল যে, এনআইডি ছাড়া ফরেন এক্সচেঞ্জ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন না।”

খানিকটা আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “এতে আমি বিস্মিত হয়েছি, হতবাক হয়েছি।”নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আনোয়ার হোসেন জানান, বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারপোর্ট অতিক্রমের সময় বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। তির্যক দৃষ্টিতে তাকান কোনো কোনো দেশের কাস্টমস কর্মকর্তারা।

“তা সত্ত্বেও আমি আমার দেশকে ভালবাসি, তাই সেই পাসপোর্ট বহন করছি। দীর্ঘ ৩০ বছরেরও অধিক সময় পর আমার মনে হচ্ছে যে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট রেখে আমি অন্যায় করেছি।”তিনি বলেন,  “আরেকটি বিষয় খুব অবাক লাগে যে আমার গ্রিনকার্ড (যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতিপত্র) আছে। সেটি দেখালে কিংবা যারা আমেরিকান পাসপোর্ট বহন করেন, সেটি দেখানোর পর স্টেইট আইডির কোনো প্রয়োজন হয় না।

“তাহলে কেন বাংলাদেশের পাসপোর্ট এনআইডির পরিপূরক হবে না? কেন পাসপোর্টে এফসি অ্যাকাউন্ট করতে পারব না?”দেশে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়নি জানিয়ে প্রবাসী এই বাংলাদেশি বলেন, “নানাবিধ কারণে গত ৮/৯ বছর আমি বাংলাদেশে যেতে পারিনি বলে এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করার সুযোগ হয়নি।

“এজন্য প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি মাতৃভূমিতে বিনিয়োগের সুযোগ নিতে সক্ষম হচ্ছি না, অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব না হওয়ায়।”নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় সপরিবারে বসবাসরত খুলনার সন্তান আনোয়ার হোসেন জানান, তার স্ত্রী-সন্তানেরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট নিয়েছেন।

“কিন্তু আমি নিইনি। লাল-সবুজের বাংলাদেশের আবহে বাকিটা জীবন অতিবাহিত করার অভিপ্রায়ে। এ অবস্থায় মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের বিড়ম্বনা দেখলেই স্ত্রী-সন্তানেরা তিরস্কার করেন।“আমার মত আরও অনেক প্রবাসী এমন পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত হয়েছেন। এর অবসান দরকার।”

মনস্তাপ জানিয়ে তিনি বলেন, “মন্ত্রী, এমপি, আমলা, স্পিকার, প্রেসিডেন্ট সকলেই প্রবাসীদের আহ্বান জানান বিনিয়োগের জন্য। অথচ সহজে বিনিয়োগের ক্ষেত্র এখনও তৈরি করা হয়নি।“এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে সোনালী ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা খোলার দাবির প্রতিও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

“এমনকি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসে কন্স্যুলেটে বিনিয়োগ-সেল খোলার ব্যাপারেও কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অথচ বিনিয়োগের স্বার্থেই এগুলো জরুরি।

আনোয়ার হোসেন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টে জন্মস্থান লেখা রয়েছে বাংলাদেশ। সেটিই বড় প্রমাণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্মগত অধিকারের প্রসঙ্গে। সেই পাসপোর্টকেও এনআইডির বিকল্প ভেবে নেওয়া যায়।“পাসপোর্টকেও এনআইডির চেয়ে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ভাবা উচিত। কারণ, এখন সকলেই মেশিনে রিডেবল পাসপোর্ট বহন করছেন। এনআইডির পরিপূরক সকল তথ্য রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অসংখ্য বাংলাদেশি রয়েছেন যারা অভিবাসনের মর্যাদা না পাওয়ায় বহু বছর দেশে যেতে পারছেন না উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, “তারা এনআইডি পাবেন কিভাবে?”

প্রবাসীদের সমস্যার কথা তুলে ধরে আনোয়ার হোসেন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে বেশ ক’জন বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, যারা এখনও নানাবিধ কারণে দেশে যেতে সক্ষম না হওয়ায় মাসিক ভাতা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।“একইভাবে অভিবাসনের মর্যাদাহীনরা আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্বেও বাংলাদেশে কোনো সহায়-সম্পদ ক্রয় করতে পারছেন না। বিক্রির ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে।”

তাদের দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, এনআইডির বিকল্প হিসেবে পাসপোর্টকে বেছে নেওয়া হোক। এছাড়া, জন্মস্থান বাংলাদেশ লেখা রয়েছেন এমন বিদেশি পাসপোর্টকেও এনআইডির বিকল্প ভাবা উচিত।ডিজিটাল বাংলাদেশে এধরনের পশ্চাৎমুখী ব্যবস্থা প্রবাসীরা সহজভাবে নিতে চাচ্ছেন না। সামনে এগিয়ে চলার স্বার্থেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এই সমস্যা সমাধানের অনুরোধ তাদের।

এক্ষেত্রে নিউইয়র্কসহ ওয়াশিংটন দূতাবাস, কানাডার টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, অটোয়া দূতাবাসে এনআইডি কার্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করার মাধ্যমেও পরিস্থিতির সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করেন প্রবাসীরা।