কামাল আহমেদ।

যেকোনো প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে তাই প্রথমেই মৌলিক যে প্রশ্ন জানা জরুরি, তা হলো কার প্রয়োজনে সেটি করা হচ্ছে? নজির হিসেবে এখানে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিটিআরসির আইনের আলোচনাও করা যায়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন সংশোধন করা হয় এবং এটি এখন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) আইন, ২০১০ নামে পরিচিত। এই সংশোধনে মূল আইনের কয়েকটি ধারায় ‘টেলিযোগাযোগ’ কথাটি সংশোধন করে ‘টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ’ করা হয়। ১৬ নম্বর দফায় ‘কমিশন’ শব্দ সরকার দ্বারা প্রতিস্থাপন করে কার্যত ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষমতাও সরকার নিয়ে নেয়। নিয়ন্ত্রণ এবং আপাতদৃষ্টে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কমিশনের ক্ষমতা অধিগ্রহণই যে আইন তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য, তার আদর্শ নজির এর চেয়ে বেশি আর কী হতে পারে?

নাগরিক প্রত্যাশা ছিল টেলিসেবার ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষাই হবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাজ। বাস্তবে হয়েছে উল্টো। ভোক্তার স্বার্থ এখন শুধু দূর অস্তই নয়, মনে হয় এটি এখন সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। নয়তো এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছে যে বিরোধী দলের লোক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ফোনালাপ ফাঁসের অনাচারের বেলায় গত এক দশকে তারা শুধুই দর্শক। আমাদের শত বিরোধিতা সত্ত্বেও কথিত নিরাপত্তার অজুহাতে ফোনের জন্য বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন চাপিয়ে দিয়েও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে হতাশাজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গ্রাহকদের তথ্য এখন কত দেশি-বিদেশি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে পৌঁছে গেছে, তা তারাও জানে কি না সন্দেহ। না হলে এত পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপনের খুদে বার্তার অত্যাচার আমাদের সইতে হতো না। আর সিম ক্লোনিং নামক ব্যবস্থায় পরিচয় চুরি এবং তা ব্যবহার করে জালিয়াতি ও প্রতারণার ভয়াবহ ঘটনাগুলোর রেকর্ডই-বা তারা কীভাবে অস্বীকার করবে।

টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রে তাদের এখন প্রধান মাথাব্যথা যেন সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ। আনুগত্য ক্রয় ও ভীতির পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে মূলধারার মিডিয়ায় সরকারের সমালোচনা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মোটামুটি পূরণ হওয়ার পর এখন নিয়ন্ত্রণের পরিধি বাড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিন্নমত দমনই যে সরকারের লক্ষ্য, সে বিষয়ে কোনো রাখঢাক নেই। সরকারের উদ্দেশ্যসাধনে বিটিআরসি যে সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ফাঁস হওয়া ভিডিও অপসারণে বিদেশিরা তাদের কথা শোনে না বলে তারা এখন চায়, বাংলাদেশে তথ্যের আধার বা সার্ভার স্থাপন ও অফিস করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হোক। অথচ জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ বা সাংবাদিকতার ব্যতিক্রম (যেমন তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠতার ভিডিও) ছাড়া অন্য যেসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আড়ি পাতা ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, সেগুলো বন্ধ করতে না পারার দায় তারা গ্রহণ করছে না।

প্রস্তাবিত ‘পারসোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট’-বিষয়ক আলোচনায় এই পটভূমি ও নজিরগুলো বাদ দিলে তাতে নতুন আইন তৈরির উদ্দেশ্য যেমন বোঝা যাবে না, তেমনি নাগরিক অধিকারের ওপর এর প্রভাব ও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ উপেক্ষিত থেকে যাবে। টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। গত জুনে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ফেসবুক ও ইউটিউবের কাছে যত তথ্য চেয়েছে, তার মাত্র ৪০ শতাংশ দিয়েছে ফেসবুক ও ইউটিউব। তারা শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাস–সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। কিন্তু কোনো নাগরিক যদি জঙ্গিবাদ বা গুজব ছড়ায়, তখন আর তথ্য দেয় না। তারা বলে, এগুলো বাক্‌স্বাধীনতা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যথেষ্ট নয়। এ সমস্যা সমাধানে নতুন আইন করা হচ্ছে। তার খসড়াও করা হয়েছে।’ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের যুগে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো জঙ্গিবাদের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়—এমন দাবি নিয়ে আলোচনার কিছু নেই।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমরা চাই না আমাদের নাগরিকদের তথ্য অরক্ষিত থাকুক। ফেসবুক ও গুগল এখন নতুন ঔপনিবেশিক শক্তি। সামনের দিনগুলোয় তথ্য হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। মানুষ বুঝে বা না বুঝে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য এদের হাতে তুলে দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনাও ঘটেছে’ (‘ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ চায় সরকার’, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, প্রথম আলো)। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, কথিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু, কোনো ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়া ও তদারক ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব তথ্য ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে অনেকেই ইউরোপের জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশনের (জিডিপিআর) কথা বলেছেন। সমস্যা হচ্ছে, ইউরোপ আইন করেছে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার সুরক্ষিত করতে, ওই সব ব্যক্তিগত তথ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য নয়। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি বা প্রযুক্তি–দৈত্য হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কোম্পানিগুলোর সার্ভার নিজেদের সীমানায় স্থাপনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে নয়। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট ভোটের পর এই ডেটার রাজনৈতিক ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ ওঠে এবং ব্রেক্সিটপন্থী একাধিক অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ব্রিটেনের স্বাধীন তথ্য কমিশনার জরিমানাও করেছেন। নাগরিক স্বার্থে ওই দপ্তরের ভূমিকার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্তও দেওয়া যায়। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, মাস্টারকার্ড, টি মোবাইলের মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত (জন্মতারিখ, ঠিকানা, ক্রেডিট কার্ডের নম্বর ইত্যাদি) তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণে ওই সব কোম্পানিকে জরিমানা ও গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। সন্ত্রাস দমন বা গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আছে বিচারিক তদারকের বিধান।

আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যই হচ্ছে সরকারের হয়ে কাজ করা যে কাউকেই এগুলো ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া, যাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য খ্যাত ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে বলে প্রতিষ্ঠিত। তারপরও প্রস্তাবিত আইনে তাঁদের জন্য সরল বিশ্বাসের অজুহাত জুড়ে দিয়ে তাঁদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। কার্যকর গণতন্ত্র ছাড়া এসব বিষয়ে অর্থবহ কোনো আলোচনা অসম্ভব। তাই বলে নীরবতাও কোনো কাজের কথা নয়। এ ধরনের অগণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন তৈরির উদ্যোগের বিরুদ্ধে তাই নাগরিক প্রতিবাদের কোনো বিকল্প নেই।

  • কামাল আহমেদ সাংবাদিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here