আরিফ আহমেদ।

চলতি বছরের মধ্যে পরপর তিনবার বরিশালে এসেছেন কৃষিমন্ত্রী ড আব্দুর রাজ্জাক। সর্বশেষ ৩ আগষ্ট বুধবার বৃষ্টিভেজা সকালে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কৃষি অঞ্চল ঘুরে এসে সমবেশ বা কর্মশালার আয়োজনে অংশ নেন তিনি বরিশালের জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে। সেখানে উপস্থিত বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, আপনাদের সহযোগিতা পেলে আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশে তেল আমদানি ৪০ ভাগ কমে যাবে।

ইতিহাসের আলোকে বঙ্গবন্ধু ও আব্দুর রব সেরনিয়াবাত এর অবদান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর ২০/২৫ হাজার কোটি টাকার তেল আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ টাকা যদি উন্নয়নের কাজে লাগানো যায় তাহলে বাংলাদেশ সবদিক থেকে সয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। আমরা যদি স্থানীয়ভাবে ৫০ ভাগ তৈল জাতীয় ফসলের উৎপাদন করতে পারি তাহলে আগামী তিন বছরের মধ্যে ৪০ ভাগ তেল আমদানি কমিয়ে আনবো ইনশাআল্লাহ। মন্ত্রী বলেন, এজন্য বরিশাল বিভাগের স্থানীয় সরকার, পানি বিভাগ সহ সকল স্তরের সমন্বয়ে একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করে পাঠান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে খুবই আন্তরিক, তিনি তা অনুমোদন করে দেবেন এটা আমার বিশ্বাস।

দুই মাস আগে গত ৯ মে সোমবার বরিশালের বাকেরগঞ্জে ঝড়ঝাপটা উপেক্ষা করে কৃষিমন্ত্রী ড আব্দুর রাজ্জাক কৃষি অঞ্চল পরিদর্শন শেষে বলেছেন, ‘বরিশাল একসময় শস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির অভাবে মাত্র একটি ফসল আমন ওঠার পর বরিশালে বছরের ছয় থেকে সাত মাস বিপুল পরিমাণ জমি পতিত থাকে। ফলে সেই খ্যাতি হারিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা বরিশালের সেই শস্যভান্ডারের খ্যাতি পুনরুদ্ধার করতে চাই।’

ঐ সময় ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের মতো বরিশালের জমিকে বহু ফসলি করতে আমরা মহাপরিকল্পনা নিয়েছি। দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প আমরা হাতে নেব। টাকা নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা উদ্যোগের। এবার সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ অঞ্চলের ১০০ একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। ব্রি উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু ধানের জাত সম্প্রসারণ করে এ অঞ্চলকে কৃষিতে স্বয়ম্ভর করা হবে।’

গত ১০ এপ্রিল কৃষিমন্ত্রী বরিশাল হয়ে ভোলা সফর করেন। সেখানে মাঠে সরাসরি কৃষকদের সাথে কথা বলেন তিনি। নিজেই একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ হওয়ার কারণে কৃষি সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ের খুঁটিনাটি তার নখদর্পে। ভোলা থেকে ফিরতি পথে মন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভোলার লবণাক্ত জমিতে চাষ হচ্ছে ব্রি ধান ৬৭, বিনা ধান ১০। ভু্ট্রা, মুগ, সয়াবিন, সূর্যমুখী, শশার আবাদ দিন দিন বাড়ছে। তরমুজের ফলনও ভালো চলতি বছর। এছাড়া, পেঁয়াজ, বার্লি, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন সবজি ফসল চাষের খুবই সম্ভাবনাময় এলাকা ভোলা। মন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রণোদনা পুনর্বাসন র্কাযক্রমের ফলে এসবের আবাদ দিন দিন বাড়ছে।

ভোলার সদর উপজেলার চর মনশা গ্রামে সমন্বিত ফল বাগান, বারোমাসি আম, সূর্যমুখী, চিনাবাদামসহ তেল জাতীয় ফসল ও পেঁয়াজের মাঠ পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মো: আব্দুর রাজ্জাক এমপি। এসময় তিনি আরো বলেন, বছরে ৮-১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমাদের আমদানি করতে হয়। আমাদের প্রয়োজনের সময় ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। দেশে দাম বেড়ে যায়। আমরা পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাই। ভোলায় অঞ্চলে বারি-৪ পেঁয়াজের ফলন ভাল, সুস্বাদু। এটিকে আমরা সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। পেঁয়াজে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন নয়, ২-৩ বছর পরে পেঁয়াজ রপ্তানিও করতে পারবো বলে দাবী করেন কৃষি মন্ত্রী।

বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। সহনশীল পর্যায়ে এসেছে আমদানিকৃত সয়াবিনও। বিশেষ করে টিসিবি পণ্যের কারণে বাজারের অস্থিরতাও কেটেছে বলে জানান কৃষিবিদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক।

একান্ত আলাপে মন্ত্রী বলেন, কৃষিতে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও কৃষককে লাভবান করা। কিন্তু মুনাফাখোর, পাইকার ও আড়তদার, মধ্যস্বত্বভোগী, সামাজিক সমস্যা, চাঁদাবাজি প্রভৃতির কারণে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পায় না। মধ্যস্বত্বভোগী সারা পৃথিবীতেই আছে। কৃষকেরা তো সরাসরি কাওরান বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারবে না, কাউকে না কাউকে মাঝখানে দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী যাতে কৃষক এবং ভোক্তাকে শোষণ ও ঠকাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এটি নিশ্চিত করতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

মন্ত্রী বলেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ ভোজ্য তেল দেশেই উৎপাদন করা হবে। এ জন্য সরিষা, সয়াবিন এবং সূর্য্যমুখীকে প্রাধান্য দিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরী করা হয়েছে। আর তা বাস্তবায়ন করা হলে দেশে ৫০ ভাগ ভোজ্য তেলের চাহিদা স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি।

তিনি আরো বলেন, এ জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে এবং অর্থ বরাদ্দও হয়েছে। কর্মপরিকল্পনা ঠিক থাকলে আগামীতে বরিশাল ও দেশের দক্ষিণাপশ্চিমাঞ্চল শস্য ভান্ডারের পূর্বের গৌরব পুনরুদ্ধার করে বিভিন্ন ফসল দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করতে পারবে।

এসময়, সারের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে যে সারের কেজি ছিল ৬০ টাকা। তা কমিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬ টাকা করেছেন। এরপরও আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য কমলে সরকার তা বিবেচনায় আনবে।

তিনি বলেন, বিএনপি চাচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে সেই ঘোলা পানি রাজনৈতিক লাভ নেয়া। বিএনপি যদি মনে করে দেশের মানুষ খবর রাখে না তাহলে তারা ভুল করবে। বিএনপির লুটতরাজ দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারনে দেশের অর্থনেতিক ভেঙ্গে পড়েছিল দেশে সন্ত্রাসে রাজত্বের সৃষ্টি হয়েছিল। দেশের মানুষ তা অবগত রয়েছে।

মন্ত্রী দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক কারনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে তাতে করে দেশে কোন হাহাকার হবে না, চরম সংকট হবে না এবং দেশে দুৃর্ভিক্ষ হবে না। দেশের মানুষ আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে আছে এবং থাকবে।

একনজরে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক 

টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কৃষিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সরকারের কৃষি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৭ জানুয়ারি ২০১৯ এ। এর আগে তিনি ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে টাঙ্গাইল-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরপর চারবারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ড. আব্দুর রাজ্জাক ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ড. আব্দুর রাজ্জাক টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্দি গ্রামে ১৯৫৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জালাল উদ্দিন এবং মাতার নাম রেজিয়া খাতুন। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৭২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের পর তিনি যুক্তরাজ্যের অ্যাঞ্জেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ালেখা করেছেন। বাংলাদেশে ফার্মিং সিস্টেম রিসার্চ ও স্থায়ী গ্রামীণ কৃষি উন্নয়ন বিষয়ে তিনি অন্যতম একজন বিশেষজ্ঞ।

রাজ্জাক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে (বিএডিসি) একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন এবং ২০০১ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি জীবন শেষ করেন এবং একইবছর প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে শেখ হাসিনার চতুর্থ মন্ত্রিসভায় তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ২০১৬ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। একজন সৎ ও সুবিবেচক মন্ত্রী এবং সাংসদ হিসেবে শুধু নিজ এলাকা নয়, সারাদেশে তিনি সমান জনপ্রিয়।

 

(লেখক। সাংবাদিক) ।