রোববার ভোরে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পর পদ্মা সেতু দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। পদ্মা সেতু, ২৬ জুনছবি: দীপু মালাকার

ইলিয়াস হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রোববার সকাল সাড়ে ৬টায় বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে ব্লিচিং পাউডারবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। বেনাপোল-মাগুরা-ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড় হয়ে পদ্মা সেতু পার হয়ে ঢাকায় পৌঁছান দুপুর ১২টায়। মাগুরার কামারখালী সেতু, মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ সেতু, সদ্য নির্মিত পদ্মা সেতু ও কেরানীগঞ্জের কুচেমাড়া সেতুর টোল বাবদ ৩ হাজার ৪৩৫ টাকা খরচ হয়েছে। অন্যদিকে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট হয়ে আসতে তাঁর ১ হাজার ২০০ টাকা কম খরচ হয়। কিন্তু ইলিয়াসের মতে, ট্রাকের ভেতরে নির্ঘুম রাত, ফেরিঘাটে অপেক্ষা, খাওয়া ও পকেট খরচ হিসাব করলে এই টাকা খুব একটা বেশি নয়। ইলিয়াসের কাছে ‘পদ্মা সেতু’ সত্যিই আশীর্বাদের নাম।

ইলিয়াস হোসেন বলেন, এখন থেকে সুযোগ পেলেই পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ-চট্টগ্রামের ট্রাক নিয়ে যাবেন। তবে নবীনগর, গাজীপুর, সাভার, গাবতলী, বাবুবাজারের দিকে যেতে হলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটই ব্যবহার করতে হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এখন হয়তো আগের মতো ফেরিঘাটে যানজট থাকবে না।

বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল, যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি হয়। এসব শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে প্রতিদিন বন্দর থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক বের হয়। দেশের উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের উদ্দেশে এসব ট্রাক বন্দর ছেড়ে যায়। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, কেরানীগঞ্জসহ আশপাশ এলাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের পণ্য পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে পারাপারের সহজ হবে। তবে উত্তরবঙ্গ ও ঢাকার সাভার, গাজীপুর, পাবতলীসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পণ্য নেওয়ার জন্য দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটই ভরসা থাকছে।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দীন গাজী বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে প্রতিদিনই অন্তত ৬০০ ট্রাক পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। এর মধ্যে প্রায় ২৫০ ট্রাক পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে যাবে। পদ্মা সেতু উন্মুক্ত হওয়ায় সময় বাঁচবে। ভোগান্তি লাঘব হলো। তবে টোলের পরিমাণ ফেরি পারাপারের সমান হলে ভালো হতো। এ ছাড়া বেনাপোল-যশোর-নড়াইল-ফরিদপুর ভাঙার মোড় হয়ে পদ্মা সেতু পারাপার হলে সময় আরও একটু কমবে। কিন্তু কালনা সেতু চালু না হওয়ায় সেটা হচ্ছে না।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোল থেকে তিন পথে এখন ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বেনাপোল–যশোর-নড়াইল-ভাঙ্গা মোড়-পদ্মা সেতু-গুলিস্তান পর্যন্ত ২১১ কিলোমিটার, বেনাপোল-যশোর-মাগুরা-ফরিদপুর ভাঙ্গার মোড়-পদ্মা সেতু-গুলিস্তানে পর্যন্ত ২৪৪ কিলোমিটার এবং বেনাপোল-যশোর-ফরিদপুর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া-ঢাকার গুলিস্তান পর্যন্ত ২৯৩ কিলোমিটার। বেনাপোল-যশোর-নড়াইল-ফরিদপুর-ভাঙ্গার মোড়-পদ্মা সেতু-গুলিস্তান এই সড়ক যোগাযোগ এখনো প্রস্তুত হয়নি। নড়াইলে মধুমতী নদীর ওপরে নির্মিত কালনা সেতুর কাজ শেষ হয়নি। এ ছাড়া ফরিদপুরের ভাঙ্গার মোড়-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার রাস্তা অত্যন্ত সরু। যে কারণে অতিরিক্ত ৩৩ কিলোমিটার পথ ঘুরে বেনাপোল বন্দরের ট্রাক ঢাকাতে নিতে হচ্ছে।

সওজ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, নড়াইলের মধুমতী নদীর ওপরে নির্মিতব্য কালনা সেতুর কাজ শেষ হতে সেপ্টম্বর মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। এ ছাড়া ফরিদপুরের ভাঙ্গার মোড়-নড়াইল-যশোর-বোনপোল পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণের জন্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা এতে ব্যয় হবে। যশোর-নড়াইল পর্যন্ত সড়কটি ১৮ ফুট থেকে ২৪ ফুটে সম্প্রসারণের জন্য ৫৫ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুত চলছে। এ কাজের জন্য এক বছর সময় লাগবে। কালনা সেতুর উদ্বোধন ও নড়াইল-যশোর সড়ক সম্প্রসারণ হলে পদ্মা সেতুর পুরোপুরি সফলতা যশোরবাসী পাবে বলে আশা করছেন।