একেএম শাহনাওয়াজ

সমাজে বসবাস করেও অনেক কিছু আমাদের অজানা থাকে। সমাজ সংশ্লিষ্ট এ ধারার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সংশ্লিষ্ট সরকারি দায়িত্বশীলদের দৃষ্টিতে পড়ে কিনা, আমাদের জানা নেই। তবে আমি চমকে গেলাম ভিন্ন সময়ে দুটি বাস্তবতা দেখে। বছর কয়েক আগে বিক্রমপুরে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাড়ির সামনেই মসজিদ। একটি ছোট্ট ঘর আছে ইমাম সাহেবের থাকার জন্য। ইমাম সাহেবের পরিবার তাদের গ্রামের বাড়িতে থাকে। এখানে গ্রামবাসীরা পালা করে তার খাবাবের ব্যবস্থা করেন। ইমাম সাহেব সাকুল্যে বেতন পান চার হাজার টাকা। মসজিদ কমিটি সময় মতো চাঁদা আদায় করতে পারেন না বলে সে বেতনও পুরোটা নিয়মমতো দেওয়া হয় না। আরেকটি অভিজ্ঞতা হলো গত সপ্তাহে। আমি সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে নিজের বাড়িতে উঠেছি। খুব দরিদ্র এলাকা এটি। এলাকার মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গেলাম। শুনেছি, বাংলাদেশে মসজিদ নির্মাণের জন্য টাকার অভাব হয় না। মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ তৈরির প্রতিযোগিতাও দেখা যায়। কারা কাকে টপকে মসজিদের জৌলুস বাড়াতে পারে, তেমন মানসিক অসুস্থতাও রয়েছে। অথচ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিপিএটিসির পেছনে প্রায় এক হাজার মানুষের বসতিতে এমন বিপন্ন মসজিদের অবয়ব আমাকে বেশ ব্যথিত করল।

বারান্দার মতো একটি টিনশেড ঘর আছে, সেখানে ৪০ জনের মতো মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। এর লাগোয়া পশ্চিম অংশে যে জায়গাটি রয়েছে, সেখানে দুই কাতারে ২৫ জনের মতো মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। সামনে ইমাম সাহেবের দাঁড়ানোর জায়গা। এ পুরো জায়গাটিতে কোনো ছাদ নেই। মাথার ওপর বাঁশের কাঠামো করে ওপরে পাতলা ত্রিপল দেওয়া আছে। অসংখ্য ছিদ্র তাতে। মুসল্লিরা জানালেন, বৃষ্টি নামলে এখানে নামাজ পড়া যায় না। সামনের প্রায় তিন শতক জায়গায় ৪ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে গ্রেটবিম ও পিলার করে ফেলে রাখা হয়েছে। অর্থের অভাবে ছাদ দেওয়া হয়নি। মসজিদ কমিটির আশঙ্কা, এ রমজানে আগের বছরগুলোর চেয়ে আরও বেশি কষ্ট হবে। কারণ এরই মধ্যে মহল্লায় বসতি অনেক বেড়েছে। মুসল্লির সংখ্যাও বেড়েছে।

ডিসিদের ক্ষমতা চাওয়ায় পরিকল্পণামন্ত্রীর সায় নেই

জুমায় ইমাম সাহেবের বয়ান শুনে আমার বেশ ভালো লাগল। মনে হলো, তিনি বেশ পড়াশোনো জানা ইমাম। মসজিদ কমিটির কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে চমকে উঠলাম। এ ২০২২ সালে একজন ইমাম সাহেবের বেতন সাকুল্যে ৫০০০ টাকা! আর মুয়াজ্জিন সাহেব পান ৩০০০ টাকা! এটি কোনো অজপাড়া গাঁ নয়। বিপিএটিসি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে একটি বিপন্ন মসজিদের হালহকিকত। আর অসহায় ইমাম ও মুয়াজ্জিন সাহেবদের জীবনের গল্প এখানে। কারও যদি বিশ্বাস না হয়, আমি ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি-সরেজমিনে দেখে যাবেন একবার। ‘বায়তুন নূর জামে মসজিদ’, পূর্ব জামসিং (জয়পাড়া), বিপিএটিসি, সাভার, ঢাকা।

এসব জেনে আমার পাশাপাশি দুটি বিষয় মনে হলো। প্রথমটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া দেশে নানা অঞ্চলে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা আছে, যাদের মাথার ওপর কোনো সংগঠনের ছায়া নেই। অথচ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার অনেকটা দায় মেটাচ্ছে। দেশের এত উন্নয়নের কথা শুনি এবং দেখিও; কিন্তু অদেখা থেকে যাচ্ছে অনেক কিছুই। আমরা মনে করি, সমাজ উন্নয়নে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এরা সবাই প্রকৃত উন্নয়নের হাতিয়ার। অথচ এদের পরিবার অর্ধভুক্ত থাকছে। সমাজে তারা সম্মান হারাচ্ছেন। তাদের নিয়ে বা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের তেমন পরিকল্পনার কথাও শুনি না।

মতামত। ১৫ বছরে ট্রিলিয়ন ডলারের দেশ হতে পারে বাংলাদেশ

দ্বিতীয়টি মসজিদের ইমাম আর মন্দিরের পুরোহিত। ওপরে উল্লিখিত ধারার স্থানীয় মসজিদ-মন্দির উন্নয়ন ও ইমাম সাহেব ও পুরোহিতদের সাধারণ জীবনমান সুরক্ষার চিন্তা রাষ্ট্রকে করতে দেখি না। অথচ মহল্লার মানুষের বসতি ঘিরেই কিন্তু ধর্মীয় চাহিদা পূরণে স্থানীয়রাই গড়ে তুলেন মসজিদ। মন্দিরও তৈরি হয় একই কারণে। দিনে দিনে জনবসতি বড় হয়। বাস্তবতার দায়েই মসজিদে মুসল্লিদের ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে মসজিদের সংস্কার ও সম্প্রসারণ করতে হয়। কিন্তু সব অঞ্চলের মানুষের সমান সামর্থ্য থাকে না। ফলে এসব দায়িত্ব পালনে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয়। সরকারের একটি ধর্ম মন্ত্রণালয় রয়েছে আর এর অধীনে রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। মাঝে মাঝে দেখি, এ প্রতিষ্ঠান ইমাম প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে মসজিদের নানা উন্নয়নে কাজ করে। কিন্তু আমি জানিনা, এসব প্রতিষ্ঠান একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মসজিদের চাকচিক্য বাড়াতেই ভূমিকা রাখে; না এসব বিপন্ন মসজিদের কথাও জানে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তালিকায় এ ধারার মসজিদের নামযুক্ত আছে কিনা, যে মসজিদ ওয়াকফ করা জায়গা থাকা সত্ত্বেও তিন-চতুর্থাংশ মুসল্লিকে জায়গা দিতে পারে না। বৃষ্টি এলে নামাজ বন্ধ করে অন্য আশ্রয়ে যেতে হয় অথবা ভিজে ভিজে নামাজ আদায় করতে হয়। রমজান এলে আনন্দের চেয়ে আতঙ্ক বেশি কাজ করে। যেখানে বাড়ির পার্টটাইম গৃহকর্মীর বেতন বা দিনমজুরের পারিশ্রমিকের চেয়ে কম বেতনে ইমাম মুয়াজ্জিন নিরূপায় হয়ে মসজিদের দায়িত্ব নেন, সেখানে ধর্ম মন্ত্রণালয় কী ভূমিকা পালনের জন্য রয়েছে, এ প্রশ্ন আমাদের মধ্যে থেকে যাচ্ছে। উল্লিখিত ‘বায়তুন নূর জামে মসজিদে’র দুর্দশা দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাঝারি অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সব শুনে জানালেন, মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনো ফান্ড নেই। আবেদন করলে ২৫-৩০ হাজার টাকার অনুদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেখানে মসজিদটিতে মাথাগোঁজার ঠাঁই এবং মেঝে ঠিক করার জন্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা প্রয়োজন, সেখানে এ অনুদানে কী হবে। অন্য একটি সূত্র জানাল, যদি সচিব-মন্ত্রীদের কাছে পৌঁছানো যায়, তাহলে তারা চাইলে বড় ফান্ড দিয়ে মসজিদ-মন্দির ঠিক করে দিতে পারেন। আমি নিরীহ শিক্ষক। অতদূর পৌঁছানোর ক্ষমতা আমার নেই। আর স্বল্পশিক্ষিত দরিদ্র এলাকাবাসীর পক্ষে তো এ ধারার তদবির করার পথই অচেনা।

সরকার ছাড়াও ধনাঢ্য ইসলামি সংগঠন আছে দেশে। তারা এ ধরনের সংকটে কোনো ভূমিকা রাখে কিনা, তা আমাদের জানা নেই। ধর্মের নামাবরণে একটি ডাকসাইটে ধর্মীয়-রাজনৈতিক দল রয়েছে-হেফাজতে ইসলাম। এ প্রতিষ্ঠানের নাকি অর্থবিত্তের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতাদের কাছে সবিনয় জিজ্ঞাসা-তারা কি ইসলামের হেফাজতের জন্য বিপন্ন মসজিদ ও অসহায় ইমামদের পাশে দাঁড়াতে পারেন না? নাকি পূর্বশর্ত হিসাবে তাদের শিবিরে নাম লেখাতে হবে?

‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম পরিবর্তন করার সাহস কারও নেই’

অবশ্য এটি আমাদের দেশে রাজনীতির ফর্মুলা হয়ে গেছে। যেমন আমরা দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ থেকে শুরু করে সেমিনারে বক্তা ঠিক করা পর্যন্ত যে দল যখন ক্ষমতায় থাকেন, তাদের অনুগত বা ভাবাদর্শের শিক্ষক খোঁজা হয়। এখানে পাণ্ডিত্য কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন থেকে দেখে আসছি, জাতীয় পর্যায়ে সরকারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা পুরস্কারের জন্য ক্ষমতাসীন দলের আদর্শে বিশ্বাসী এবং দলীয় সান্নিধ্যে থাকা মানুষরাই পুরস্কার পাওয়ার তালিকায় থাকেন। বিএনপি আমলে দেখেছি, পুরস্কার পাওয়ার জন্য উজ্জ্বল গুণী মানুষ হলেও শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্ন থাকার কারণে এবং রাজনীতি-নিরপেক্ষ মানুষ হওয়ায় তারা কখনো পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতেন না। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালেও একই ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, আমার পরিচিত এক পুস্তক প্রকাশক জানালেন-প্রতিবছর সরকার প্রকাশকদের কাছ থেকে একটি বড় বাজেটে বই কেনে। সেখানেও নাকি বইয়ের গুণ বিচার না করে লেখক ও প্রকাশকের দলীয় পরিচয় খোঁজা হয়। আমি অবশ্য অভিযোগটি শতভাগ বিশ্বাস করতে পারিনি। এমন ধারার বাস্তবতার উঠানে দাঁড়িয়ে আমি জানি না, রাজনীতির সংস্রবমুক্ত এ নিরীহ এলাকাবাসীর মসজিদ সংস্কারে ও ইমাম সাহেবদের সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করার জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে কিনা।

আমার বিনীত প্রস্তাব থাকবে-সারা দেশে এ ধরনের বিপন্ন মসজিদ, মন্দির সংস্কার ও ইমাম সাহেবদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার একটি কমিশন গঠন করতে পারে। কমিশন এ ধরনের বিপন্ন মসজিদ ও ইমাম সাহেবদের তালিকা করে বাস্তব অবস্থা স্পষ্ট করতে পারেন। এলাকার মানুষদের সম্পৃক্ত করে এ কমিশন যদি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে, তা হবে দেশোন্নয়নের একটি মাইলফলক। কমিশন তখন নতুন তালিকা উপস্থাপন করতে পারবে। সেই মতে অবহেলিত ইমাম সাহেবদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে পারে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এ বিপুল শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এভাবে সমাজ সংস্কার ও মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।

পরিকল্পনামন্ত্রী। ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ জাতির মূল উদ্দেশ্যের পথে কাঁটা

নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে সেই যুদ্ধাপরাধী বিচারের সময় অপরাধী পক্ষের উন্মাদনার কথা। সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখা যায়, এমন গুজব ছড়িয়ে গ্রামের মানুষদের উত্তেজিত করে থানা আক্রমণের কথা। তখন আমরা লিখেছিলাম। উগ্র রাজনীতিকরণের দাপটে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা অনেক আগেই মাঠ ছেড়ে যার যার রাজনৈতিক বলয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা সাধারণ মানুষকে আলোকিত করতে তেমন কোনো ভূমিকা পালন করছেন না। খালি মাঠ পেয়ে মানুষকে ধর্মান্ধ করার জন্য উগ্র ধর্মীয়-রাজনৈতিক দলগুলো আগেই পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষদের কাছে। ধর্মের অপব্যবহার করে তাদের উত্তেজিত করে নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে।

আমাদের বিশ্বাস, গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা হাজারও স্কুল, মাদ্রাসার শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ইমাম সাহেবদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এ ধরনের সামাজিক কাজে যুক্ত করা যায়। দেশ ও সমাজ উন্নয়নে এসব বড় ভিত্তি হতে পারে। শিক্ষক ও ইমাম সাহেবদের অসহায়ত্বের সুযোগেই কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে তৎপর।

ড. এ কেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here