বাঙালির ঐতিহ্য মসলিন।। ওবায়দুল মুন্সী।।

মসলিনের প্রাচীন নাম মলমল।

বাংলা মসলিন শব্দটি আরবি, ফার্সি কিংবা সংস্কৃতমূল শব্দ নয়। মসলিন শব্দটি এসেছে দমসূলদ থেকে। ইরাকের এক বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র হলো মসূল। এই মসূলেও অতি সূক্ষ্ণ কাপড় প্রস্তুত হতো। এই দমসূলদ এবং দসূক্ষ্ণ কাপড়দ -এ দুযে়র যোগসূত্র মিলিযে় ইংরেজরা অতিসূক্ষ্ণ কাপডে়র নাম দেয় দমসলিনদ। অবশ্য বাংলার ইতিহাসে দমসলিনদ বলতে বোঝানো হয় তৎকালীন ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অ লে উৎপাদিত অতি সূক্ষ্ণ একপ্রকার কাপড়কে।

অতি সূক্ষ্ণ সূতায় তৈরী বলে মসলিন হতো খুবই স্বচ্ছ। মসলিন প্রস্তুত করা হতো পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও অ লে। কথিত আছে যে মসলিনে তৈরি করা পোশাকসমূহ এতই সুক্ষ্ণ ছিলো যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেতো।

 

মুঘলদের পরাজিত করে বাংলা দখল করল ব্রিটিশ বেনিয়ারা। রাজ্য ক্ষমতা দখলের পূর্বেই তারা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের বিলেতি শাড়ীর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হল ঢাকার মসলিন। তাই তারা মসলিনকে চিরতরে দূর করে দিতে চাইল। প্রথমেই তারা মসলিন কাপড়ের উপর অত্যধিক শুল্ক বা ট্যাক্স চাপিয়ে দিল। বিলেত থেকে আমদানী করা কাপড়ের উপর শুল্ক ছিল ২-৪%। কিন্তু মসলিনসহ দেশি কাপড়ের উপর তারা ট্যাক্স বসাল ৭০-৮০%। তাই দেশে যেমন বিলিতি কাপড় সুলভ হল, একই সাথে ব্যয়বহুল হয়ে উঠল মসলিনসহ দেশি কাপড়। প্রতিযোগিতায় তাই মসলিন টিকতে পারছিল না। কিন্তু তারপরও টিকেছিল মসলিন। যখন ইংরেজ শাসকগণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে মসলিন তৈরির উপর। তাদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেও চলত মসলিনের উৎপাদন। তখন ব্রিটিশরাজ চড়াও হল মসলিনের কারিগরদের উপর। তারা মসলিন কারিগরদের ধরে ধরে তাদের হাতের আঙ্গুল কেটে দেয়া শুরু করল যাতে গোপনে গোপনে তারা মসলিন তৈরি করতে কিংবা এর নির্মাণকৌশল অন্যদের শিক্ষা দিতে না পারে। আর এভাবেই একদিন বাঙালিরা হারিয়ে ফেলল তাদের গর্বের মসলিন তৈরির প্রযুক্তিজ্ঞান।

 

 যাদুকরী ঢাকাই মসলিন হারিযে় গিয়েছিল  ১৭০ বছর পূর্বে। বাঙালিরা তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের যে সামান্য কিছু বিষয় বা বস্তু নিয়ে গর্ববোধ করত এবং এখনো করে তাদের মধ্যে প্রধানতম হলো মসলিন কাপড়।

ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি এ কাপড় তার সূক্ষ্ণতার জন্যই সারা বিশ্বে বিখ্যাত ছিল। ভারতের মুঘল রাজপরিবার তো বটেই এমনকি ব্রিটিশ রাজরানীদেরও নাকি প্রথম পছন্দের কাপড় ছিল ঢাকাই মসলিন।

মসলিনকে আলাদা করা হতো সূক্ষ্ণতা, বুননশৈলী আর নকশার পার্থক্যে। এরই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রকার মসলিনের আলাদা আলাদা নাম হযে় যায়। যেমন-

 

মলবুস খাস

দমলবুস খাসদ মানেই হলো খাস বস্ত্র বা আসল কাপড়। এজাতীয় মসলিন সবচেযে় সেরা আর এগুলো তৈরি হতো সম্রাটদের জন্য। আঠারো শতকের শেষদিকে মলবুস খাসের মতো আরেক প্রকারের উঁচুমানের মসলিন তৈরি হতো, যার নাম দমলমল খাসদ। এগুলো লম্বায় ১০ গজ, প্রস্থে ১ গজ, আর ওজন হতো ৬-৭ তোলা। ছোট্ট একটা আংটির মধ্যে দিযে় এ কাপড় নাড়াচাড়া করা যেতো। এগুলো সাধারণত রপ্তানি করা হতো।

 

সরকার-ই-আলা

এ মসলিনও মলবুস খাসের মতোই উঁচুমানের ছিলো। বাংলার নবাব বা সুবাদারদের জন্য তৈরি হতো এই মসলিন। সরকার-ই-আলা নামের জায়গা থেকে পাওয়া খাজনা দিযে় এর দাম শোধ করা হতো বলে এর এরকম নামকরণ। লম্বায় হতো ১০ গজ, চওড়ায় ১ গজ আর ওজন হতো প্রায় ১০ তোলা।

 

ঝুনা

দঝুনাদ শব্দটি, জেমস টেইলরের মতে, এসেছে হিন্দী ঝিনা থেকে, যার অর্থ হলো সূক্ষ্ম। ঝুনা মসলিনও সূক্ষ্ম সুতা দিযে় তৈরি হতো, তবে সুতার পরিমাণ থাকতো কম । তাই এজাতীয় মসলিন হাল্কা জালের মতো হতো দেখতে। একেক টুকরা ঝুনা মসলিন লম্বায় ২০ গজ, প্রস্থে ১ গজ হতো। ওজন হতো মাত্র ২০ তোলা। এই মসলিন বিদেশে রপ্তানি করা হতো না, পাঠানো হতো মোঘল রাজ দরবারে। সেখানে দরবারের বা হারেমের মহিলারা গরমকালে এ মসলিনের তৈরি জামা গাযে় দিতেন।

 

আব-ই-রওয়ান

আব-ই-রওয়ান ফার্সি শব্দ, অর্থ প্রবাহিত পানি। এই মসলিনের সূক্ষ্ণতা বোঝাতে প্রবাহিত পানির মতো টলটলে উপমা থেকে এর নামই হযে় যায়। লম্বায় হতো ২০ গজ, চওড়ায় ১ গজ, আর ওজন হতো ২০ তোলা। আব-ই-রওয়ান সম্পর্কে প্রচলিত গল্পগুলোর সত্যতা নিরূপন করা না গেলেও উদাহরণ হিসেবে বেশ চমৎকার। যেমন: একবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে তার মেযে় উপস্থিত হলে তিনি মেযে়র প্রতি রাগান্বিত হযে় বললেন তোমার কি কাপডে়র অভাব নাকি? তখন মেযে় আশ্চর্য হযে় জানায় সে আব-ই-রওয়ানের তৈরি সাতটি জামা গাযে় দিযে় আছে। অন্য আরেকটি গল্পে জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খান বাংলার সুবাদার থাকাকালীন তার জন্য তৈরি এক টুকরো আব-ই-রওয়ান ঘাসের উপর শুকোতে দিলে একটি গরু এতোটা পাতলা কাপড় ভেদ করে ঘাস আর কাপডে়র পার্থক্য করতে না পেরে কাপড়টা খেযে় ফেলে। এর খেসারৎস্বরূপ আলীবর্দী খান ঐ চাষীকে ঢাকা থেকে বের করে দেন।

 

খাসসা

ফার্সি শব্দ খাসসা। এই মসলিন ছিলো মিহি আর সূক্ষ্ম, অবশ্য বুনন ছিলো ঘন। ১৭ শতকে সোনারগাঁ বিখ্যাত ছিলো খাসসার জন্য। ১৮-১৯ শতকে আবার জঙ্গলবাডি় বিখ্যাত ছিলো এ মসলিনের জন্য। তখন একে দজঙ্গল খাসসাদ বলা হতো। অবশ্য ইংরেজরা একে ডাকতো দকুষাদ বলে।

 

শবনম

দশবনমদ কথাটার অর্থ হলো ভোরের শিশির। ভোরে যদি শবনম মসলিন শিশির ভেজা ঘাসে শুকোতে দেয়া হলে শবনম দেখাই যেতোনা, এতোটাই মিহী আর সূক্ষ্ম ছিলো এই মসলিন। ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ প্রস্থের শবনমের ওজন হতো ২০ থেকে ২২ তোলা।

 

নয়ন সুখ

মসলিনের একমাত্র এই নামটিই বাংলায়। সাধারণত গলাবন্ধ রুমাল হিসেবে এর ব্যবহার হতো। এজাতীয় মসলিনও ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ চওড়া হতো।

 

বদন খাস

এজাতীয় মসলিনের নাম থেকে ধারণা করা হয় সম্ভবত শুধু জামা তৈরিতে এ মসলিন ব্যবহৃত হতো, কারণ দবদনদ মানে শরীর। এর বুনন ঘন হতো না। এগুলো ২৪ গজ লম্বা আর দেড় গজ চওড়া হতো, ওজন হতো ৩০ তোলা।

 

সর-বন্ধ

ফার্সি শব্দ সর-বন্ধ মানে হলো মাথা বাঁধা। প্রাচীন বাংলা উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা মাথায় পাগডি় বাঁধতেন, যাতে ব্যবহৃত হতো সার-বন্ধ। লম্বায় ২০-২৪ গজ আর চওড়ায় আধা থেকে এক গজ হতো; ওজন হতো ৩০ তোলা।

 

ডোরিয়া

ডোরা কাটা মসলিন দডোরিয়াদ বলে পরিচিত ছিলো। লম্বায় ১০-১২ গজ আর চওড়ায় ১ গজ হতো। শিশুদের জামা তৈরি করে দেয়া হতো ডোরিয়া দিযে়।

 

জামদানী

জামদানি কার্পাস তুলা দিযে় প্রস্তুত একধরনের পরিধেয় বস্ত্র। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপডে়র উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাডি় বাঙ্গালী নারীদের অতি পরিচিত। মসলিনের উপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। জামদানি বলতে সাধারণত‍ঃ শাডি়কেই বোঝান হয়। তবে জামদানি দিযে় নকশী ওড়না, কুর্তা, পাগডি়, রুমাল, পর্দা প্রভৃতিও তৈরি করা হত। ১৭০০ শতাব্দীতে জামদানি দিযে় নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এছাড়া, মুঘল নেপালের আ লিক পোশাক রাঙ্গার জন্যও জামদানি কাপড় ব্যবহৃত হত। তবে আগেকার যুগে দজামদানীদ বলতে বোঝানো হতো নকশা করা মসলিনকে।

 

মসলিন গবেষকদের মতে,ইতিহাস গ্রন্থে সর্বোচ্চ ১২০০ কাউন্ট সুতার মসলিনের কথা লিখা আছে এবং ‘রঙ্গদ, দআলিবালিদ, দতরাদ্দামদ, দতনজেবদ, দসরবুটিদ, দচারকোনাদসহ সবমিলিয়ে প্রায় ১০০ প্রকার মসলিন আছে।

 

ব্রিটিশ শাসনামলে বিভিন্ন দেশের কলকারখানা থেকে সাশ্রয়ী কাপড় আমদানি করায় এবং অতিরিক্ত কর বা ভ্যাট আরোপের কারণে একসময় হারিয়ে যায় আমাদের ‘বাঙালি ঐতিহ্য মসলিন!’

সেই মসলিন ফিরিয়ে আনতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১৫,সালে ১২৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। ২০২১ সালের ইতিহাসের পাতায় আজকের বাঙালিরা জানবে যে, অনেক বছর পূর্বে তাদের হারিয়ে যাওয়া ‘মসলিন’ দুনিয়াময় যে খ্যাতি ছড়িয়ে ছিল, বাংলদেশ জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘মসলিন’ আবার নতুন করে নতুনভাবে তার মূল স্থানে ফিরে এসেছে।

 

বাঙালির হারিয়ে ফিয়ে পাওয়া এই ‘মসলিন’ আবার তার পূর্বখ্যাতি অর্জন করে, পদ্মা সেতুর মতো সারা বিশ্বকে অবাক করে দেবে সেই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

 

মতামত লেখকের নিজস্ব।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক,সাধারণ সম্পাদক (সুসাস),সুনামগঞ্জ।