অসিত রায়

ইতিহাস বিকৃতকারীরা কী দেশপ্রেমিক?

কথাটা আমার নয়, বর্তমান ভারত সরকার যাদের ক্রমাগত লাঞ্ছনা করে চলেছে সেই খ্যাতনামা রমিলা থাপার, ইরফান হাবিব, অমর্ত্য সেন দের মত বুদ্ধিজীবীদের ।বস্তুত এই ভয়ঙ্কর ইতিহাসের যারা কারিগর,তাদের মত পৈশাচিক শক্তি এর আগে ভারতের শাসন ক্ষমতায় আসেনি। ইতিহাসের পূর্ব ধারণা ছিল গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সামাজিক ন্যায়ে বিশ্বাসী । যারা ইতিহাস বিকৃত করছেন, তাদের সহিংসতার শেষ বলি ফাদার স্ট্যান স্বামীর মত ৮৪ বছরের জেসুইট ফাদার। যার জীবন কেটে গেছে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা আন্দোলনে। ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব এই শক্তির দ্বারা শুরুর থেকেই লাঞ্ছিত হয়ে আসছেন। কেন সরকার ইতিহাসের বই তাদের নিজেদের মত করে লেখাতে চাইছে? এই প্রথমবার বিজেপির রাজনৈতিক মুখোসের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের হিন্দু রাষ্ট্রের গঠন প্রকল্পের দিকে পাখির চোখের মত করে বসে আছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের ইতিহাস সাম্প্রদায়িক রূপে লেখার এজেন্ডাকে তারা উন্মত্ত গতিতে কার্যকরী করার অবস্থায় গত সাত বছরে নিয়ে এসেছে। নীচের আলোচনার ভিত্তি হল ইরফান হাবিবের রচনা।

রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে দেখতে গেলে হিন্দু ঐক্যের সাধারণ ভিত্তি হল তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। এই ইতিহাস বদলানো হল তাদের দীর্ঘস্থায়ী এক বিদ্বিষ্ট চেতনা প্রক্রিয়ার দার্শনিক পটভূমি। ভারতীয় সংস্কৃতি শক-হুন-দল-পাঠান-মোগল এক দেহে লীন হওয়া ভক্তিবাদ ও সুফিবাদের লেবাসে নানা উপাদানে পাওয়া মিশ্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এটা ছিল সমন্বয়বাদী আদর্শ। কিন্তু আইডেন্টিটির ভিত্তিতে নির্মিত হিন্দুত্ববাদ বস্তুত সংখ্যাগুরুবাদ। তার ভিত্তিতে নির্মিত জাতীয়তাবাদ অন্য সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর কাছে কি গ্রহণযোগ্য? যেখানে বড় গোষ্ঠী ছোট গোষ্ঠীর সাথে বিবাদ ঘটাতেই উদগ্রীব? সংস্কৃতির বিশুদ্ধতার নামে অভারতীয় উৎসকে বর্জন করার সংগঠিত রাষ্ট্রীয় প্রয়াসের অর্থ হল ইতিহাসের মর্মবস্তুতে কুঠারাঘাত। বিশ্বস্ত এই কাজে নেমে পড়েছে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন। স্নাতক শ্রেণীর পাঠক্রম কাঠামোতে গালভরা নামের এক শিখন ফলাফল বানানো হয়েছে। টপিক গুলি আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। প্রবীণ শিক্ষক ও গবেষকরা কিন্তু এটা করেন নি।

প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসবিদ বা শিক্ষকরা এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছেন। ভারতের ইতিহাসে ছয়টা পেপার আছে যার মধ্যে মধ্যযুগের (১২০০-১৭০৭) জন্য বরাদ্দ মাত্র একটি পেপার। যার ফলে ছাত্ররা ছয় ভাগের এক ভাগ সময় পাবেন যা আজকের দিনে আছে অন্তত এক তৃতীয়াংশ। এর অর্থ হল , সত্য যাই থাক না কেন, অতীত ইতিহাসকে গৌরব মন্ডিত করা হবে। বলা হয়েছে, ইতিহাস হল জাতির আত্মা। হরপ্পা-মহেঞ্জদারোর আবিষ্কৃত সভ্যতাকে বলা হচ্ছে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা। শিভালিকের সাথে একটি ছোট স্রোতধারা সরস্বতীকে যুক্ত করে দাবি করা হচ্ছে, হরপ্পার সংস্কৃতি বেদের সাথে যুক্ত। আর ঋকবেদে সরস্বতী নদীর উল্লেখ আছে। আসল উদ্বেগ হল, হরপ্পা সংস্কৃতির সঙ্গে দ্রাবিড় যোগসূত্র অস্বীকার করা। অথচ মাছ ও তীরের চিন্হ সিন্ধু শিলমোহরগুলিতে স্পষ্টতই আছে। প্রাচীন আর্য গৌরব নিয়ে এই ইতিহাস প্রণেতারা এতই উত্তেজিত যে এবার একটি অধ্যায় নতুন করে যোগ করা হচ্ছে যার নাম আর্যদের আদি বাসভূমি ।স্পষ্টত লেখকরা আর্য জাতির প্রতি ভালবাসায় এতখানি মোহাচ্ছন্ন যে ফ্যাসিস্তদের অনুকরণ করতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। এর পরের অধ্যায়, আর্য আক্রমণের মিথ। যেন ভারতীয়দের উপর বিশেষ সম্মান আরোপ করা হল । আজকের জগতে যখন জাতিবাদ ও বর্ণবাদের কোন উল্লেখ সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয় সভ্যসমাজে, সেখানে নতুন করে এইসব বিষয়গুলি নিয়ে আসা প্রমাণ করে যে লেখকরা হয় মস্তিষ্ক বিকৃত অথবা উন্মাদ। ইতিহাসবিদ তো নয়ই । আরেকটি অদ্ভুত বিষয় হল, মহাকাব্যের সংস্কৃতি। যেন রামায়ণ-মহাভারতে সব সত্য ঘটনা বলা আছে। ইতিহাস যেন সেভাবেই ঘটেছিল ।

পরের অধ্যায় খৃষ্টপূর্ব ছয় শতক থেকে মৌর্য যুগ পর্যন্ত। মনে রাখতে হবে বুদ্ধের সময়ও বর্ণ বা জাতিভেদ সমাজে ভালভাবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। শূদ্র এবং বর্ণ বহির্ভূত জাতিব্যবস্থা দাসত্বের পথ ধরে প্রচলিত ছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার,সিলেবাসে কোথাও বর্ণবাদ উদ্ভবের উল্লেখ নেই।এর উল্লেখ একমাত্র পাওয়া যাচ্ছে মধ্য যুগে (১২০০-১৭০৭) যাকে তাঁরা মধ্য যুগ বলছেন। সিলেবাসে রাখা হয়েছে মনুস্মৃতি,রামায়ন,মহাভারত,কামসুত্র।বাদ গেছে অনেক বৌদ্ধ টেক্সট,মিলিন্দপনহ,যখন মহাযান শাখা প্রসার পেয়েছিল চীনে।এসব সিলেবাস থেকে বাদ পড়েছে । তৃতীয় পেপার একটি বিরাট পর্ব ধরে প্রাচীন ভারতের গুণ কীর্তন করেছে। কিন্তু স্নাতক শ্রেণীর পঞ্চম পেপার মাত্র ৬৫০ বছর জুড়ে। সেখানে উপেক্ষা করা হয়েছে হিউএন সাং,বানভট্ট এমন কি পরবর্তী কালের আল বেরুনিকে। যদিও আমরা সবাই জানি ১০৩৫ সালে লিখিত তাঁর কিতাব উল হিন্দ মিশ্র ভারতীয় সংস্কৃতি,ধর্মীয় বিস্বাস ও বিজ্ঞানের নানা বিষয় তুলে ধরেছিলেন মুল সংস্কৃত থেকে।সঙ্ঘী ইতিহাস রচয়িতারা অসম্ভব দুর্বলতা দেখিয়ে রাজপুত বীরদের চরিত্র এঁকেছেন তাদের পতনকে রোমান্টিক বিয়োগান্ত নাটকের শেষ অঙ্ক হেসেবে দেখিয়েছেন।

প্রত্যাশা মতই তাঁরা অষ্টম শতকে সিন্ধুতে আরব সভ্যতার প্রভাব সম্পর্কে চোখ বন্ধ করেই রেখেছেন। ধর্মীয় ধারণা , জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিতের বিশাল অগ্রগতি দেখলেনই না।বিশেষ করে ব্রহ্মগুপ্তের রচনা। ভারতীয় সংখ্যাতত্ব কিভাবে আরব দুনিয়ায় স্থান পেল তা সত্যি বিস্ময়ের।

কোশাম্বি এবং রামশরণ শর্মা ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের নানা দিক উন্মোচন করেছেন। কৃষির বাস্তবতা ও সংকট আমরা তাদের লেখাতেই পাই। মুদ্রা হিসেবে সোনা এবং রুপা কিভাবে রহস্যজনক প্রক্রিয়ায় উধাও হয়ে গেল সে সম্বন্ধে কোন জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যাবে না সিলেবাসে । অথচ দিল্লিতে মুসলিম শাসন নিয়ে একটা অধ্যায় সম্পূর্ণ সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বিষ্টতা ছাড়া আর কোন প্রয়োজনে যুক্ত হয়েছে বলে মনে হয় নি। ভারতে সুফিবাদের হাত ধরে ইসলামের আগমন নিয়ে ইতিহাস সিলেবাস আশ্চর্য রকম নীরব। অথচ সুফি লেখক আলি হুজিরির কাশফুল মাহজুব নামে বইটি লেখা হয়েছিল ১০৭১ এর আগে লাহোরে তার কোন উল্লেখ নেই। দিল্লির সুলতানদের উপর লেখা একটি ছোট অধ্যায়ে বিধৃত।

আলাউদ্দিন খলজির কৃষির সংস্কার,মুল্য হ্রাস করার প্রনালি, মোঃ তুঘলকের আমলে কৃষির উন্নতি বাদ। তুর্কী,খলজি,তৈমুরের আক্রমণ একটা ক্যাপসুলের মত দায়সারা ভাবে পেশ করা হল। আকবরের ভূমিসংস্কার,ধর্মীয় সহিষ্ণুতা , রাজপুতদের সাথে সমঝোতার সুফলদায়ী নীতি। সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ। প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক সমীক্ষা এসবের কোন উল্লেখ নেই। আবুল ফজলের আইন ই আকবরি সম্পূর্ণ বাদ। অথচ হিমু বিক্রমাদিত্য, রাণা প্রতাপ,রানী দুর্গাবতী আর চাঁদ বিবির উপর বিশাল লেখা।জাহাংগীর ও শাহজাহান বলে কোন মুঘল সম্রাট যেন ছিলেনই না। হিন্দু ও মুসলিম সমাজ আলাদাভাবে বিবেচিত দ্বিজাতিতত্ব হিসেবে পড়তে হবে।পলাশির যুদ্ধ বা বাংলার অস্তমিত স্বাধীনতা নির্বাসিত। অনেক ক্ষেত্রে পরম্পরা মানা হয় নি।

 

রামমোহন,সতীদাহ ইত্যাদির কোন উল্লেখ নেই। জমিদারী, মহলওয়ারী প্রথা সামান্য আলোচিত।স্বাধীনতা আন্দোলন নমো নমো করে সারা হয়েছে। জওহরলাল নেহরু্র সমাজতন্ত্র, বিজ্ঞান পরিত্যক্ত। সেকুলার রাজনীতির বদলে বলতে হবে পরিচিতির রাজনীতি।গ্রন্থপঞ্জির মধ্যে কিছু পরিচিত লেখক বাদ। সিন্ধু সভ্যতাকে চালানো হচ্ছে আর্য সভ্যতা। ইতিহাস সিলেবাস হিন্দুত্ব রাজনীতির সঙ্গে তালমিল রেখেই যথাযথ বিকৃত।১৯৩৮ সালে আর এস এসের সরসংঘচালক গোলওয়ালকার ‘উই অর আওয়ার নেশানহুড ডিফাইন্ড’ বই লেখেন। সেখানেই স্পষ্ট ছিল হিন্দুরাষ্ট্রের লক্ষ্য। আজ তাদের সমস্ত লক্ষ্য ধাবিত হচ্ছে সেই দিকে। আজ বিজেপির মাধ্যমে তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। ১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভার সভাপতি হয়েও সাভারকার একই কথা বলেছিলেন। তাই যে বিবাদ আজ এসেছে তা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আগের বিজেপি সরকারের আর এস এস যোগসূত্র ততটা প্রবল না থাকলেও তাদের নির্দেশে সরকার স্কুল পাঠ্যবই বদলে দিয়েছিল। এবার ক্ষমতা বেশি, বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করেছে। সারা দেশের জনতার এখন একজোট হওয়া প্রয়োজন এদের বিরুদ্ধে । রমিলা থাপার খোলাখুলি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দুত্ববাদী অপপ্রচার দিয়ে রাঙ্গিয়ে নতুন ইতিহাস পাঠ্যবই লেখা হচ্ছে। বহু সহস্র স্কুলে শুরু হয়ে গিয়েছে এই বিপজ্জনক কার্যক্রম । দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here