ফাইল চুরি করেই কোটি টাকার মালিক!

তিতাসের সংযোগ দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের তিন সদস্য

আতাউর রহমান, ঢাকা। ১৭ জুন ২০২১।

 

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) অন্তত ৫০০ ফাইল চুরি করে একটি চক্র গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই চক্রটি নিজেদের তিতাসের কর্মী পরিচয় দিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নতুন সংযোগ দেওয়া এবং বকেয়া বিল আদায়ের নামে এসব টাকা তুলে নিয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি ওই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এ তথ্য বেরিয়ে আসে।
সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালে আবাসিক ভবন বা বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ ঘোষণার আগে যেসব গ্রাহক সংযোগ পেতে আবেদন করেছিলেন, যাদের অবৈধ সংযোগ রয়েছে এবং যাদের পুরোনো বিল বকেয়া রয়েছে- এ ধরনের অন্তত পাঁচ শতাধিক ফাইল চুরি করেছে চক্রটি। এরপর চক্রের সদস্যরা নিজেদের তিতাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে নতুন সংযোগ দেওয়া, বকেয়া বিল আদায় বা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। চক্রটি পুরো রাজধানীকে চার ভাগে ভাগ করে এসব অপকর্ম করে আসছিল। এদের সঙ্গে তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
সিআইডি সূত্র জানায়, রাজধানীর মহাখালীতে নয়তলা একটি আবাসিক ভবনে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে গ্যাস সংযোগ পেতে আবেদন করে মালিক পক্ষ। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) ডিমান্ড নোট পাওয়ার পর ওই ভবনে গ্যাস সংযোগও দেয়। তবে ভবনটির গ্রাহকদের বিলের ব্যাংক হিসাব খোলার আগেই ওই বছর আবাসিক ভবনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। কিন্তু ওই ভবনটিতে সংযোগ থেকেই যায়। সম্প্রতি সেখানকার আবেদন করা গ্রাহকের ফাইল চুরি করে চক্রটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং বকেয়া বিল আদায়ের নামে ২০ লাখ টাকা দাবি করে ১৪ লাখ টাকা আদায় করে। একইভাবে হাতিরঝিল এলাকায় একটি ভবনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা বলে কয়েক লাখ টাকা আদায় করে।

এ দুটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ওই চক্রের সদস্য হাবিবুর রহমান, সাইফুল নজরুল ও মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডির (ঢাকা মেট্রো-দক্ষিণ) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান  বলেন, প্রতারক চক্রটি তিতাস গ্যাস কোম্পানির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে গ্রাহকের অন্তত ৫০০ ফাইল চুরি করেছে। সেইসব ফাইলের তথ্য নিয়ে তিতাসের পরিচয়পত্র ও লোগো সংবলিত গাড়ি ব্যবহার করে বিভিন্ন বাসায় যেত। নিজেদের তিতাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে নানাভাবে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এভাবে তারা সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব নষ্ট করে আসছিল। রাজধানীতে এ ধরনের বেশ কয়েকটি চক্র রয়েছে। সিআইডি পুরো ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।

তিনি বলেন, প্রতারক চক্রটি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে তিতাসের কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর সংবলিত রসিদ দিত। এরা কীভাবে এসব রসিদ পেয়েছে, এসব রসিদে স্বাক্ষর করা কর্মকর্তারা কারা এবং ফাইলগুলো অফিস থেকে সরাতে তিতাসের কারা কারা সহায়তা করেছে, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। কিছু তথ্য চেয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষকেও চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

টিজিটিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মোহাম্মদ নুরুল্লাহ বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন। তবে বিভিন্ন জোনাল অফিস থেকে কিছু ফাইল খোয়া গেছে বলে জানতে পেরেছেন। যাচাই করে এসব বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতারক চক্রের সঙ্গে যদি তিতাসের কেউ জড়িত থাকে, অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সিআইডি সহায়তা চাইলে তদন্তে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।গ্রেপ্তার তিনজন জানিয়েছে, তারা একসময় তিতাসে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করতেন। অফিসে নানা ফাইলপত্র এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে নিয়ে যেতেন। স্টোর বিভাগেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিতাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ে ওঠে। এভাবে অফিস থেকে তারা বিভিন্ন ফাইল পেয়ে থাকেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান  বলেন, ওই তিনজন তাদের সহায়তাকারী হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম জানিয়েছে। এসব নাম যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে আইনের আওতায় নেওয়া হবে।