প্রশ্ন- নিষ্পাপ রবিনের অপরাধ কী?

গত রোববার কুষ্টিয়া শহরে প্রকাশ্যে স্ত্রী আসমা, সৎ ছেলে রবিন ও এক বিকাশকর্মী শাকিলকে গুলি করে হত্যা করেন পুলিশের এএসআই সৌমেন রায়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে শহরের কাস্টমস মোড় এলাকার নাজ ম্যানশন মার্কেটের বিকাশের দোকানের সামনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

রবিনের মতো পাঁচ বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশুকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেন সৌমেন। শিশুটিকে সবার শেষে গুলি করা হয়। দৌড়ে পালিয়েও বাঁচতে পারেনি রবিন। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা সবার মুখে মুখে। হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট, চায়ের দোকান- সবখানেই হত্যাকাণ্ডের আলোচনা। সবার একই প্রশ্ন- নিষ্পাপ রবিনকে কেন খুন করলেন সৌমেন ? নিষ্পাপ শিশুটির অপরাধ কী?

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, রোববার বেলা সোয়া ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে কাস্টমস মোড়ের নাজ ম্যানশন ভবনের সামনে দুজন পুরুষ, একজন নারী ও এক শিশু দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। তার আগে তারা হোটেলে কিছু খেতে যান। কিন্তু কঠোর বিধিনিষেধের কারণে তাদের বসতে দেয়নি হোটেল মালিক। পরে তারা নাজ ম্যানশনের নিচতলার কলাপসিবল গেটের ভেতরে চলে যান।
গেটের ভেতরে যাওয়ার পর সেখানে হঠাৎ চারটি গুলির শব্দ হয়। সঙ্গেসঙ্গেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। একজন নারী এবং একজন পুরুষের শরীরে গুলি লাগে। তারা মাটিতে পড়ে যান। এর মধ্যে শিশুটি বের হয়ে আসে। সে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে পেছনে পিস্তল হাতে ছুটে আসেন অস্ত্রধারী সৌমেন। তিনি শিশুটির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর তিনটি গুলি করেন। এরপর আবার দ্রুত কলাপসিবল গেটের মধ্যে চলে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, এসময় উপস্থিত লোকজন অস্ত্রধারী সৌমেনকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় তিনি গেটের মধ্যে গিয়ে মোবাইলে কথা বলেন এবং উপস্থিতদের লক্ষ্য করে চারটি গুলি ছোড়েন। তার মাথায় লাগে স্থানীয়দের ছোড়া ইট। তবে তার ছোড়া গুলি স্থানীয় কারও গায়ে লাগেনি। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী বিশু মিয়া বলেন, আমি ঘটনাস্থলের পাশেই মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গুলির শব্দ শুনে আমরা সামনে গিয়ে দেখি ছোট্ট একটি শিশু দৌড়াচ্ছে। এসময় সৌমেন এসে শিশুকে তিনটা গুলি করলেন। মোট প্রায় ১১টি গুলির শব্দ পাওয়া যায়। তিন মিনিটে তিন জনকে হত্যা করা হয়।

কুষ্টিয়ার আলোচিত এ ট্রিপল মার্ডার মামলায় দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত এএসআই সৌমেন কুমার রায়। সোমবার (১৪ জুন) বিকেলে কুষ্টিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. এনামুল হকের আদালতে তিনি এ স্বীকারোক্তি দেন। দুপুর একটা ১০ মিনিটের দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

দুপুর একটা পাঁচ মিনিটের দিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে। পরে বিকেল চারটা ২৫ মিনিট পর্যন্ত তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে চারটা ৩০মিনিটে তাকে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুষ্টিয়া মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নিশিকান্ত সরকার বলেন, নিহত আসমা খাতুনের মা হাসিনা খাতুন বাদী হয়ে রোববার হত্যা মামলা করেছেন। আসামি সৌমেনকে দুপুরে আদালতে নেওয়া হয়। তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এদিকে এএসআই সৌমেন রায়কে রোববার বিকেলে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় খুলনা রেঞ্জ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। খুলনা রেঞ্জের দুজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ কুষ্টিয়ায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খায়রুল আলম বলেন, ঘটনা জানার পর সৌমেন রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এরপর তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে সর্বশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, সৌমেন রায় ২০১৫ সালে কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে উন্নীত হন। পরে ২০১৬ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানায় যোগ দেন। সেখান থেকে জেলার অন্যান্য থানায়ও কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ মিরপুর থানার হালসা ক্যাম্পে ছিলেন। এরপর বাগেরহাট হয়ে খুলনার ফুলতলা থানায় যোগ দেন।