জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকটের সমাধান করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের সংস্থাসমূহকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউ ইয়র্ক পৌঁছে মঙ্গলবার সকালে সংস্থাটির শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডির সঙ্গে বৈঠকে এই সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

সফরের প্রথম দিন যেসব সভা ও অধিবেশনের সাইডলাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শেখ হাসিনা যোগ দেন, সে বিষয়ে মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন,  “সারাদিন প্রধানমন্ত্রী কর্মব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতে কক্সবাজার ও ভাষানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহায়তায় ইউএনএইচসিআরের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

“বিশেষ করে, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) মিয়ানমারে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম বৃদ্ধির উপর জোর দেন। এর জবাবে হাইকমিশনার জানান, তিনি শীঘ্রই মিয়ানমার সফর করবেন।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের যে কথা বলেছেন, তাতে একমত পোষণ করেছেন ইউএনএইচসিআর প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি।

এরপর প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর করিম এ এ খান কিউসির সঙ্গে সাক্ষাত করেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এসময় বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মধ্যে সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানান তিনি।

মোমেন বলেন, “মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলমান সকল প্রচেষ্টার প্রতি বাংলাদেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটরকে আশ্বস্ত করেন।”

আইসিসি প্রসিকিউটর করিম খান আগামী বছরের শুরুতে ফের বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্য এবং জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে দুই সপ্তাহের সফরে ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রথমে তিনি লন্ডনে যান। ১৯ সেপ্টেম্বর সেখানে রানির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিয়ে পরদিন পৌঁছান নিউ ইয়র্কে।

ইউএন হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালক মাইমুনাহ মো. শরীফের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। |ছবি: পিএমও

লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস ও নারীর ক্ষমতায়নে জোর

মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনের সভাপতি সাবা করোসির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের নারী নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।

ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া তিনি তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে নারীর সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারী নেতৃত্ব গঠন ও প্রসার নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

“তিনি লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস এবং নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেন। এছাড়া কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী নারী নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন বলে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।”

সভায় নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক, হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট, আইসল্যান্ড, সামোয়া, উগান্ডা, আরুবার প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আগের ৭৬তম অধিবেশনের সভাপতি, ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

টেকসই নগরায়নে গুরুত্ব

মঙ্গলবার বিকালে ইউএন হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালক মাইমুনাহ মো. শরীফের সঙ্গে সাক্ষাতে টেকসই নগরায়নের গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন,  “এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভূমিহীন ও গৃহহীন জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত আশ্রয়ণ প্রকল্পের সাফল্য বিষয়ে ইউএন হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালককে অবহিত করেন।”

মোমেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সহিষ্ণু, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সহনশীল নগরকাঠামো নির্মাণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি ইউএন-হ্যাবিট্যাট তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো.শাহরিয়ার আলম যুক্তরাষ্ট্রে যেসব সভা ও বৈঠকে অংশ নিয়েছেন সে ব্যাপারে ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত জানানো হয়।