পাষাণ পৃথিবী হতে এক কথাসাহিত্যিক জসীম আল ফাহিম মুস্তাফিজ সৈয়দ

জসীম আল ফাহিম। শিল্প-সাহিত্যের এক অখণ্ড তীর্থস্থান সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর গ্রামে ১৯৭৯ সালের ৩১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মেঘালয় পাহাড় প্রকৃতি আর যাদুকাটা নদীর সৌন্দর্যের মতোই তাঁর শিল্পকর্ম। বর্তমান প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ এক সৃষ্টিশীল লেখক। তাঁকে আলাদাভাবে সৃষ্টিশীল বললাম এজন্য তিনি এমনভাবে পাষাণ পৃথিবী’ উপন্যাসকে সৃষ্টি করেছেন, যা একজন সাহিত্য সমালোচক কিংবা একজন সাধারণ পাঠক তাঁকে এই তকমা দিতে বাধ্য হবেনই।

সৃষ্টিশীলতা একজন মানুষকে বিশ্বের মাঝে সমগ্র জনতার নির্জনতার মুগ্ধতায় সরব ভিত নির্মাণ করে দেয়। সৃষ্টিশীলতার চর্চা যিনি করেন তিনিই সৃষ্টিশীল হিসেবে শিল্প-শৈলীগোষ্ঠীতে স্বীকৃত হন। সৃষ্টিশীলতার বিশালতায় বিমুগ্ধ নীরবতায় এক ঐশ্বরিক উপমার নির্দশন জসীম আল ফাহিমের উপন্যাস পাষাণ পৃথিবী।
লেখক হেঁটে চলেছেন পাষাণ পৃথিবীর বুকে নীরব নিভৃতে। তবে সেই হেঁটে চলা সময়কে জব্দ করেছেন কালো অক্ষরের কারাগারে। কালো অক্ষরের সুখ-দুঃখ মিশ্রিত শব্দের লাল নীল দীপাবলির আলোর অপূর্ব স্পর্শে। অতীত ও আজকের চিন্তা-ভাবনাই বর্তমানের আয়োজন এবং আগামীর প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় সময় স্রোতে, কালের স্রোতধারার জীবননদীর প্রমত্ত অববাহিকায়।
আমরা সবাই চিন্তা করি নানা সময় নানা বিষয়ে। এসব চিন্তার কোনোটি প্রয়োজনে আবার কোনোটি অপ্রয়োজনে। কোনোটি পরিণত হয় সীমাহীন আনন্দে। আবার কোনোটি হয়ে যায় বর্ণনাতীত কষ্টের সমুদ্রে। লেখক জসীম আল ফাহিমের চিন্তার সুবিন্যস্ত ফসল উপন্যাস : পাষাণ পৃথিবী।
পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে আমি যেন ওই উপন্যাসের নগরে হারিয়ে গিয়েছি যেখানে পৃথিবী পাষাণ। বড়োই করুণ, এর সুর বেদনাবিধুর। নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন রহস্যময়তা রয়েছে, রয়েছে আলো আঁধারের ধোঁয়াশার কুয়াশার লুকোচুরি খেলা ঠিক তেমনটাই দৃশ্যমান পাষাণ পৃথিবী নামক উপন্যাসেও।
আমি যখন বইটি পাঠ করছিলাম তখন রাত তিনটা আঠারো মিনিট। পৃথিবীর এক অংশে রাত, অন্য অংশ দিন। পৃথিবীর কোনো অংশের মানুষ জেগে আছে। কোনো অংশের মানুষ ঘুমিয়ে গেছে। আবার কোনো দুঃখী মানুষ দুঃখের চাষ করছে নীরবে-নিভৃতে একাকী অন্তরালে জীবনের মায়াজালে।
আমার প্রশ্ন একটাই পৃথিবী এত পাষাণ কেন? সুহাগ কেন হারালো সব আপনজনদের? জীবন কি শুধুই হারানোর জন্য? জীবনে কি কোনো প্রাপ্তি নেই?
পাষাণ পৃথিবী নামক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুহাগ। ছোটো ভাইবোন ও মা-বাবাকে নিয়ে তার পরিবার। এ যেন বাবুই পাখির শৈল্পিক ঠিকানা। ছোটো ভাই সুহাস। ছোটো বোনটির নাম জুমু। বাবার নাম স্বপন মিয়া, মা সুলেখা বেগম।
পাষাণ পৃথিবী উপন্যাসের নামকরণ শতভাগ সার্থক। লেখক জসীম আল ফাহিম অপূর্ব সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন গ্রামীণ ও শহুরে মানুষের জীবনের চিত্র তোলে ধরতে। উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় সুহাগের বাবাকে কুপরামর্শ দিয়েছিল গ্রামের মোড়ল। স্বপন মিয়া যেন তার সন্তান সুহাগকে পড়ালেখা থেকে ছাড়িয়ে মোড়লের দোকানে সরকারের চাকরি নেয়। এখানে লেখক গ্রামীণ জীবনের অসহায় মানুষদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তুলে এনেছেন তথাকথিত ধনবানরা কীভাবে কিনে নিতে চায় মানুষের লালিত স্বপ্নকে। পাষাণ পৃথিবী উপন্যাসটিতে দেখা যায়, মুক্তার মিয়া নামের এক মানুষ সুহাগের বাবার বন্ধু। সে তাকে বলল-তোমার ছেলে তোমাদেরকে আয় রোজগার করে খাওয়াবে না। এখানেও লেখক তাঁর গল্প গঠনের গাঁথুনি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করেছেন।
উপন্যাসে দুঃখের আড়ালে পাষাণ পৃথিবীর বাস্তবতাই তুলে এনেছেন লেখক। সূচনা নামের একটি মেয়ের ভালোবাসা তাকে ডেকেছিল বড্ড নীরবে। দুজন দুজনকেই ভালোবেসেছিল। তবে ওই যে পাষাণ পৃথিবীর নিয়তি সব কেড়ে নিয়েছে নিদারুণ যন্ত্রণায়। পাষাণ পৃথিবী শুধু নামেই পাষাণ নয় এর সত্যতা আছে। বাবা স্বপন মিয়া মারা যান ফুড কোম্পানির চুল্লিতে হঠাৎ বিস্ফোরণে। জীবনের গতিপথ বদলে যায় সুহাগের। নেমে আসে পাষাণ পৃথিবীর আকাশ হতে কালো মেঘেরা। এরপর একে একে হারালো ছোটো বোন, জন্মদায়ী মা আর স্নেহের ছোটো ভাইকে। সূচনাকেও হারিয়ে ফেললো সুহাগ তার জীবনে। সূচনার হারিয়ে যাওয়া জানতে চাইলে পড়তে হবে পাষাণ পৃথিবী বইটি। ডাক্তাররা বলেন-প্রতিদিন একটি আপেল খান, সুস্থ থাকুন। আপেল খেলে মানুষের পুষ্টি হয়। আর সুহাগ তার প্রেমিকার দেখানো পথেই আপেলের বীজ খেয়ে বিদায় নিল পাষাণ পৃথিবীর বুক হতে।
পৃথিবীটা কি সবার জন্যই পাষাণ? নাকি সুহাগের মতো গুটিকয়েক জনের জন্য? বইটি পড়ে শেষ করলাম যখন তখন শেষ রাত্রির পরম সুখনিদ্রা যাপনে ডুবে আছে সবাই। আর এই আমি জেগে আছি পাষাণ পৃথিবীর কালো অক্ষরের দৃশ্যপটে। পাষাণ পৃথিবী পড়ার সময় মাঝে মাঝে মনে হয়েছিল এত চেনা দৃশ্যপট! তবে লেখকের লেখনির শোকাবহ ঘটনার বিনির্মাণ একে করে তুলেছে কষ্টের এক অনবদ্য আবিষ্কার, দুঃখের এক হোয়াংহো নদী।
লেখক জসীম আল ফাহিমের জন্য শুভকামনা রইলো। পাষাণ পৃথিবীর বুকে রাজত্ব সুদীর্ঘ অনন্তকাল কলম হাতে শব্দের জাদুতে পাঠকের অন্তরে মুগ্ধতার সব প্রহরে।

প্রকাশনী: আফসার ব্রাদার্স
প্রচ্ছদ: মশিউর রহমান
প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা: ২০১৯
মূল্য : ১২৫টাকা।