মোহাম্মদ নূরুল আমিন

এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ১৩ জনের মধ্যে চারজনকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। দুই বছর আগে আদালতে সিআইডি অভিযোগপত্র দিলেও শুরু হয়নি বিচারকাজ।

  • অভিযোগপত্র দেয়ার দুই বছরেও চার্জ গঠন হয়নি আলোচিত এই মামলার
  • এখনও গ্রেপ্তার হয়নি চক্রের ৪ সদস্য
  • সিআইডির তদন্তে ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের মতো অপরাধে জড়িত বিদেশি মাফিয়াদের নাম উঠে আসেনি
  • চক্রের প্রধান বাংলাদেশি ব্যবসায়ী চয়েজ রহমান
  • পাচারে নিম্নবিত্ত ও স্বল্পশিক্ষিত নারীদের ব্যবহার

চার বছর আগে প্রায় ৩০০ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেনসহ শ্রীলঙ্কায় গ্রেপ্তার হয় তিন বাংলাদেশি নাগরিক। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের দুই বাংলাদেশি মাফিয়াসহ ১৩ সদস্যকে চিহ্নিত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অনুসন্ধান শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুই বছর আগে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তবে এখনও শুরু হয়নি আলোচিত এ মামলার বিচারকাজ। আদালত ও সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে সূত্রে জানা যায়, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ১৩ জনের মধ্যে চারজনকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর ছয়জন কারাগারে আছেন। বাকী তিনজন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।

মহানগর দায়রা জজ আদালতের এসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিকিউটর (এ.পি.পি) মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন হাওলাদার  বলেন, আলোচিত এই মাদক মামলার অভিযোগপত্রের চার্জ গঠনের জন্য সর্বশেষ গত ১৫ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে কারাগার থেকে আসামীদের কোর্টে আনতে না পারায় চার্জ গঠন সম্ভব হয়নি।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্যরা ব্যবসায়ী ও টুরিস্ট ভিসায় এশিয়া, ইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতো। এর আড়ালে হেরোইন এবং কোকেনের বড় বড় চালান এক দেশে থেকে অন্যদেশে পাচার করে।

চক্রের কোনো কোনো সদস্যের আবার একাধিক পাসপোর্টও রয়েছে। চক্রের অন্যতম হোতা চয়েজ রহমান এবং তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড শেখ মোহাম্মদ আরিফ উদ্দিন নামে দুই বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তারা মাদক চক্রের মূল বিনিয়োগকারী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার মাফিয়াদের বাংলাদেশি সহযোগী হিসেবে তারা নিজেদের এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

সিআইডি বলছে, ২০১৪ সাল থেকে টানা ছয় বছর ধরে চয়েজ রহমানের নেতৃত্বে চক্রের সদস্যরা কোকেন ও হেরোইন সংগ্রহ করে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাই, চীন, কুয়েত, ইতালি, ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের অবাধ বিচরণ। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কায় এই চক্রের চারজন এবং চীনে একজন মাদক পাচারের সময় গ্রেপ্তারও হয়েছেন। বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও ৯ জন।

সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, এই চক্রটি সম্পর্কে বাংলাদেশি গোয়েন্দাদের কোনো ধারণাই ছিল না। ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর সূর্যমনি নামে এই চক্রের সদস্যকে ৩২.৩২৯ কেজি হেরোইনসহ শ্রীলঙ্কার রাজধানীর কলম্বোর উপকণ্ঠ মাউন্ট লাভিয়ানা থেকে গ্রেপ্তার করে সেদেশের পুলিশ। পরে ৩১ ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কায় এই চক্রের অন্যতম সদস্য দেওয়ান রাফিউল ইসলাম হিরো ও জামাল উদ্দিন ২৭০.৩০ কেজি হেরোইন এবং ৫.২৯৮ কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হন। শ্রীলঙ্কা থেকে তাদের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে সিআইডির তৎকালীন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করা হয়। তিন বাংলাদেশির পাসপোর্টের সূত্র ধরে তাদের বিষয়ে অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে হোতা চয়েজ রহমান ও আরিফ উদ্দিনের নাম সামনে আসে। তারপর তদন্তে পুরো চক্র সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সিআইডি সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের শুরু দিকে চয়েজ রহমানের উত্তরার বাসায় অভিযান চালিয়ে তার ব্যক্তিগত ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। ওই ল্যাপটপেই মেলে মাফিয়া চক্রের চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। তারপর গ্রেফতার করা হয় চয়েজ রহমানকে। উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলাও হয় তখন। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চিহ্নিত ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। একজনের সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হলেও আন্ত:দেশীয় অপরাধী চক্রের বিষয়ে এখনো অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

আদালতে জমা দেয়া চার্জশিট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিআইডির তদন্তে শুধু চক্রের বাংলাদেশিদের নাম উঠে এসেছে। তবে চক্রের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাই, চীন, কুয়েত, ইতালি, ব্রাজিলের কারা জড়িত এসবের কোনকিছুই এই তদন্তে উঠে আসেনি। যদিও সিআইডির তদন্ত টিম শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন সরেজমিন তদন্তের জন্য।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বর্তমান ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (অপারেশন) বলেন, ‘সিআইডির তদন্তে পুরো চক্রকে শনাক্ত করা হয়। জড়িতরা ভুল ঠিকানা দিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে মাদক পাচার করেছে। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারে কার কী ভূমিকা ছিল সেটা উল্লেখ করে আমরা আদালতে চার্জশিট দিয়েছি। আদালতে চার্জশিট গৃহীত হয়েছে’।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা চক্রের বিদেশি সদস্যদের শনাক্ত করতে ইন্টারপোল ও সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছি। তাদের সহযোগিতা ছাড়া জড়িতদের বিদেশে শনাক্ত করা সম্ভব নয়’।

অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা জানান, অনুসন্ধান শুরু পরই চয়েজ রহমানের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। ওই ল্যাপটপ থেকেই এই চক্রের অনেক পরিকল্পনার কথা জানা যায়। ল্যাপটপে ‘ড্রাগ মাফিয়া’ নামে একটি নথি পাওয়া যায়। ল্যাপটপে ‘বিগ বস’, ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ ‘টুডেস ফটো’, ‘ওয়ার্কার্স’ নামে কয়েকটি ফোল্ডারও পাওয়া যায়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি, একাধিক ব্যক্তির পাসপোর্টের ছবি, পাসপোর্টে মালয়েশিয়ার ভিসার ছবি এবং স্ক্রিনশট পাওয়া যায়। ল্যাপটপে একটি চিঠিও পাওয়া গেছে। সেই চিঠিতে লেখা আছে, ‘ প্রিয় স্যার, চোরাচালানকারী গ্রুপ পাকিস্তান থেকে হেরোইনের কন্টেইনার মালয়েশিয়ায় সরবরাহ করা হয়েছে। সেখান থেকে এই হেরোইন শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হবে। এখন ‘বস’ এবং তার ‘ডানহাত’ মালয়েশিয়ায় তিনদিন ধরে অবস্থান করছেন। দয়া করে তাদের খুঁজে বের করেন এবং পর্যবেক্ষণ করবেন।’ ল্যাপটপে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং একটি ভাইবার নম্বর পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের পাশে লেখা রয়েছে ‘বস’ এবং ভাইবার নম্বরের পাশে লেখা ‘দ্য সেকেন্ড বস’।

সিআইডি জানায়, ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি চয়েজ রহমানকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, শ্রীলঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া তিন জন এবং চীনে গ্রেপ্তার হওয়া একজন তার সহযোগী। এর মধ্যে সূর্যমনি ও দেওয়ান রাফিউল ইসলাম তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো। ২০১৪ সালে তাদের পাসপোর্ট করতে তিনি সহায়তা করেন। সূর্যমনি বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন। দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই তিনি শ্রীলঙ্কা এবং মালয়েশিয়ায় ঘন ঘন যাওয়া-আসা করতেন। তিনি অল্পশিক্ষিত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান।

শ্রীলঙ্কায় গ্রেপ্তার হওয়া জামাল উদ্দীনের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। ২০ বছর আগে তিনি বগুড়ায় শামীমা জামাল নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় মাদকের মামলা রয়েছে। পর্যটনের উদ্দেশ্য দেখিয়ে শ্রীলঙ্কা এবং চীনে ভ্রমণ করতেন তিনি।

সিআইডির অনুসন্ধান বলছে, চয়েজ রহমানের অন্যতম সহযোগী শাহীনা আক্তার চীনে মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন। শ্রীলঙ্কার যে বাসা থেকে রাফিউল ইসলাম এবং জামাল হেরোইন এবং কোকেনসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন ওই বাসাটি শাহীনার নামে ভাড়া নেওয়া। তিনি শ্রীলঙ্কা, চায়নাসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চয়েজ রহমানের আরেক সহযোগী শেখ মোহাম্মদ আরিফ উদ্দিন মাফিয়া চক্রের অন্যতম হোতা। তিনি চয়েজ রহমানের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করতেন। তিনি দুবাই, চীন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতেন। মাদক পাচারে বিভিন্ন দেশে ভ্রমনের ক্ষেত্রে মিটিং, ব্যবসা এবং ট্যুরিজমের কারণ দেখাতেন।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মাফিয়া চক্রের সদস্যদের পাসপোর্টে ভিসা লাগানোর কাজ করতেন রুহুল আমিন সায়মন। তিনি উন্মুক্ত বিশ্বদ্যিালয় থেকে এসএসসি পাশ করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে চাকরি করতেন। এর আড়ালে তিনি মাদক মাফিয়া চক্রে জড়িয়ে পড়েন।

মাদক বহনে নারীদের ব্যবহার

সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারে নারীদের ব্যবহার করতেন। শ্রীলঙ্কা এবং চীনে গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে দু’জন নারী। তারা হলেন সূর্যমনি ও শাহীনা আক্তার। সিআইডির অনুসন্ধানে আরও চারজন নারীর নাম বেরিয়ে এসেছে। তারা হলেন- আফসানা মিমি, ফাতেমা ইমাম তানিয়া, সালমা সুলতানা স্বপ্না ও শারমিন আক্তার মায়া। এই নারীরা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং স্বল্পশিক্ষিত। প্রলোভন দেখিয়ে তাদের টার্গেট করা হয়। তাদের মধ্যে আফসানা মিমি ও তানিয়া একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কাজ করতেন। চক্রের নারী সদস্যরা মালয়েশিয়া, দুবাই, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে মাদক পাচার করতেন।