সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে স্বাগতিক নেপালকে ফাইনালে ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। এর আগে ৫ আসরে ৫টি শিরোপা জিতেছিল ভারত। এবার ভারতকে গ্রুপ পর্বে ৩-০ গোলে হারায় সাবিনারা। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দ্বিতীয় বার ওঠেই বাজিমাত করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। ২০১৬ সালে প্রথম ফাইনালে খেলেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সেবার ভারতের বিপক্ষে হেরে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল সাবিনাদের। এবার আর ভুল করেনি বাংলাদেশের মেয়েরা। ফাইনালে নেপালকে হারানোর মধ্য দিয়ে আগে ৩ বার হারের বদলা নিলো গোলাম রব্বানী ছোটনের শিষ্যরা।

সোমবার প্রথমার্ধের ১৩ মিনিটে সময় মনিকা চাকমার ক্রসে বল পেয়ে নেপালের গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বল জালে পাঠান ( ১-০) বাংলাদেশের সামসুন নাহার। ৪১ মিনিটে পরিকল্পিত আক্রমনে শামসুন্নাহারে পাসে বল জালে জড়ান কৃষ্ণা। ফলে প্রথমার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় গোলাম রব্বানী ছোটনের শিষ্যরা। দ্বিতীয়ার্ধে ৭০ মিনিটে অনিতার গোলে ব্যবধান কমায় (২-১) নেপাল । ৭৭ মিনিটে পাল্টা আক্রমনে কৃষ্ণা রানী সরকার গোল করলে বাংলাদেশ ৩-১ গোলে এগিয়ে যায়। নেপাল পঞ্চমবারের মতো ফাইনালে খেললে শিরোপার নাগাল পায়নি।

ফাইনালের পথে চার ম্যাচে বাংলাদেশ গোল করেছে ২০টি। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গত পাঁচবারের আসরে বাংলাদেশ ও নেপাল তিনবার মুখোমুখি হয়েছে। তিনবারই জিতেছে নেপালিরা। দুই দলের প্রথম দেখা হয়েছিল ২০১০ সালে কক্সবাজারে প্রথম সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। নেপাল জিতেছিল ৩-০ গোলে। ২০১৪ সালের সেমিফাইনালে নেপালের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০১৯ সালে গ্রুপপর্বে। নেপাল জিতেছিল ৩-০ গোলে। গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলছে বাংলার মেয়েরা। মালদ্বীপকে ৩ গোলে হারিয়ে শুরু আর পরের ম্যাচেই পাকিস্তানের জালে হাফ ডজন গোল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে জয় ৩-০ গোলে। সেমিফাইনালে ভুটানকে ৮ গোলে উড়িয়ে ট্রফি জয় থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে আছে বাংলাদেশের মেয়েরা। পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ প্রতিপক্ষের জালে দিয়েছে ২০ গোল। গোলমেশিন সাবিনা একাই ৮ গোল দিয়েছেন। বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের জালে বল পাঠাতে পারেনি।

ম্যাচ শুরুর ঘন্টা খানেক আগে হয়েছে তুমুল বৃষ্টি। আর এই বৃষ্টিতে মাঠ হয়ে যায় ভারী। কিন্তু এই ভারী মাঠেও ছন্দময় ফুটবল খেলেছে মারিয়া, মনিকারা। যেন মারিয়াদের পায়ে ফুল হয়ে ফুটল ফুটবল।

ম্যাচের প্রথম মিনিটেই সুযোগ ছিল বাংলাদেশের গোল পাওয়ার। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া মারিয়ার দুরপাল্লার শট নেপালের গোলরক্ষক আনজিলা সুব্বা আটকালেও পুরোপুরি গ্লাভসে জমাতে পারেননি। সিরাত জাহানের শট শেষ পর্যন্ত কর্নারের বিনিময়ে ফেরান আনজিলা।

চোট নিয়েই আজ খেলতে নেমেছিল স্ট্রাইকার সিরাত জাহান। কিন্তু মাঠে নেমে তিনি বেশিক্ষণ খেলতে পারেননি। ব্যথায় কাতর সিরাতকে ১৩ মিনিটেই কোচ গোলাম রব্বানী তুলে নিতে বাধ্য হন। এরপর বদলি হিসেবে নামান শামসুন্নাহার জুনিয়রকে। কিন্তু কে জানতো এই সুপার সাবই এগিয়ে নেবেন বাংলাদেশকে। শামসুন্নাহার নামতেই খেলার গতি বেড়েছে আর।

ম্যাচের ১৪ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে মনিকার বাড়ানো বলে দারুণ ফ্লিকে গোল করেন শামসুন্নাহার। ৩৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি কিক নেন নেপালের দীপা শাহি। কিন্তু শটটি দারুণ দক্ষতায় ফিস্ট করেন রুপনা। গোল শোধে মরিয়া নেপাল তখন পাল্টা আক্রমণে ব্যস্ত। কিন্তু ৪১ মিনিটে নেপালি দর্শকদের স্তব্ধ করে দেন কৃষ্ণা। সাবিনার ডিফেন্স চেরা পাস ধরে বক্সে ঢোকেন কৃষ্ণা। দুর্দান্ত হাওয়ায় ভাসানো শটে গোলকিপার আনজিলার মাথার ওপর দিয়ে বল জড়ান জালে ২-০।

পিছিয়ে পড়া নেপাল তখন মরণ কামড় দিতে ব্যস্ত। দলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সাবিত্রা ভান্ডারি ছিলেন ডেঙ্গু জ্বরে অসুস্থ। পুরোপুরি ফিট না হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে নামিয়ে দেন নেপালের কোচ। সাবিত্রা নামার পর আক্রমণ বেড়েছে নেপালের। সাবিত্রা আর অনিতা মিলে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের বক্সেও ঢুকেছেন। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে ঢোকেন অনিতা। শামসুন্নাহারকে ফেলে সহজেই ঢুকে যান বক্সে। এরপর কোনাকুনি শটে বাংলাদেশের জালে জড়িয়েছেন বল। মুহুর্তেই যেন আবারও জেগে ওঠে দশরথ স্টেডিয়াম। কিন্তু সেই উল্লাস আবারও থামিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশ।

নেপালের বক্সের সামান্য বাইরে থেকে সাবিনার বাড়িয়ে দেওয়া বলে আবারও বক্সে ঢোকেন কৃষ্ণা। সামনে তখন শুধুই নেপালের গোলরক্ষক আনজিলা। সহজেই প্লেসিংয়ে কৃষ্ণা করেন ৩-১।

ঢাকা থেকে আসার আগে কোচ গোলাম রব্বানী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবার বদলে যাওয়া বাংলাদেশকেই দেখা যাবে। কথা রেখেছেন তিনি। হিমালয় জয় করেই দেশে ফিরছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। ১৯৯৯ সালে এই নেপালেই প্রথমবার দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়ছিল বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দল, ২২ বছর পর সেই নেপালেই সেরা হলেন মেয়েরা।