দক্ষিণাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহাব খানের মৃত্যুবার্ষিকী

প্রিন্স তালুকদার ॥ দেশে তখন ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা। শ’য়ে শ’য়ে মানুষ পালিয়ে বেড়াচ্ছিল এদিক ওদিক। হানাদাররা আক্রমণ চালাচ্ছে ঘরে ঘরে। এদেশেরই এক দল মানুষ, রাজাকার কিংবা আলবদর নামে সহায়তা করছে তাদের। আর তারই সাথে সাহসী তেজী তরুণেরা দেশমাতৃকাকে রক্ষায় হাতে তুলে নিচ্ছে অস্ত্র। তেমনই একজন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওহাব খান। তিনি সেমময়ে হাতের কলম রেখে দিয়ে দেশের মাটি উদ্ধারের দীক্ষা নিয়েছিল। রাজাকারদের শাস্তি দিতে গিয়ে তার মনে জেগেছিল মায়া, আবার একই সাথে প্রকাশ করেছেন হৃদয়ের ঘৃণা, যে ঘৃণা ঐ রাজাকারদের প্রাপ্য বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, নিজের ভাতৃহত্যার জন্য। বহু কষ্ট সহ্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অপারেশনে, উপলব্ধি করেছিলেন, জীবন থাকতে এ দেশমাতাকে শত্রুসেনার হাতে লাঞ্ছিত হতে দেবেন না। দেশপ্রেমের এই মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনাই তো তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল সম্মুখসমরে অংশ নিতে। তিনি যেন শামসুর রাহমানের সেই বিখ্যাত কবিতারই বাস্তব রূপায়ণ- রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো, সেই তেজি তরুণ, যার পদভারে একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে, সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা। (তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা)। স্বাধীনতা আর মুক্তির জন্য বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ এলাকার সাধারণ মানুষের উদ্বেলতার কথা তিনি অনুভব করতেন। তার মুক্তিযুদ্ধ যাত্রাপথে যখনই দেখা পেয়েছেন সাধারণ মানুষের, তখনই পেয়েছিলেন তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা। কখনও পথ চলতে চলতে অসুস্থ হয়েছিলেন, সাধারণ মানুষরাই আশ্রয় দিয়েছিল তাকে, সেবা-শুশ্রূষা করেছিল পরম আন্তরিকতায়। একাত্তরের সংগ্রামী চেতনা- দুঃসহ দিনে যে চেতনা ঘৃণা আর প্রতিশোধ গ্রহণের তীব্র আক্ষাংকায় সেই অন্ধকার দিনে অসংখ্য ছেলেকে দুঃসাহসী করে তুলেছিলেন, যাদের না ছিল যুদ্ধের কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা, না ছিল কোনো সহায়-সম্বল; কিন্তু ভালোবাসা ছিলো নিখাদ দেশমাতার শ্যামল ছায়ার জন্য। তিনি ভালবাসতেন দেশকে, বৃক্ষরাজিকে আর মাছ। দেশমাতা, পুষ্প-তাপাতা আর মাছের সঙ্গে গড়েছিলেন হৃদয়ের বন্ধন। উচ্চ বিলাসী জীবন ছেড়ে আমৃত্যু কাজ করেছেন প্রকৃতিবান্ধব সমাজ গড়ার অপেক্ষায়। আজ ১৫ ই আগস্ট, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার এ বীর সেনা আবদুল ওহাব খানের মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৮৯ সালের এই দিনে বাবুগঞ্জ উপজেলা চত্বরে আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৪৩ সালে বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের দরিয়াবাদ গ্রামে জন্মগ্রহন করেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বেইজ কমান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওহাব খান। পিতা আসমত আলী খাঁন ও মা মেহের নিগার। শ্যামল সবুজ, ছায়া ডাকা গ্রামেই কেটেছিল ওহাব খানের শৈশব। চাঁদপাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হয়েছিল তাঁর শিক্ষার হাতে খড়ি। বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ স্কুল থেকে ৮ম শ্রেনী, বরিশাল শহরের আলেকান্দা এলাকার নুরিয়া স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন ১৯৬০ সালে। এরপর বিএম কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন বরিশাল ল কলেজ (শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত আইন মহাবিদ্যালয়) থেকে এলএলবি পাশ করেন। সেসময় বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন আমির হোসেন আমু ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ওহাব খান। বাবুগঞ্জের উপজেলার এ কৃতি সন্তান স্বাধীনতা পূর্ব বরিশালে ৬০ এর দশকের একজন তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে বরিশালে নেতৃত্ব দেন তিনি। তৎকালীন বরিশাল টাউন হলকে অশ্বিনী কুমার দত্ত টাউন হল নামকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল বরিশাল পতনের পর তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করে বাবুগঞ্জের চাঁদপাশা ইউনিয়ন পরিষদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করেন। চাঁদপাশা ইউনিয়নের দরিয়াবাদের মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল মোল্লা ও আব্দুল আলিম হাওলাদার জানান দক্ষিণাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওহাব খানের যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ প্রদান, লাঠি দিয়ে কিভাবে তিনি প্রশিক্ষণ দিতেন ও ক্যাম্পের কথা। তিনি থানার সিভিল চিফ ও আগস্ট পর্যন্ত কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা ওহাব খান ঢাকা-বরিশাল সড়ক, রহমতপুর বিমানবন্দর, বাবুগঞ্জ-মুলাদী থানায় কয়েকটি যুদ্ধ অপারেশন পরিচালনা করে অসীম সাহসের পরিচয় দেন। যুদ্ধকালীন সময়ে বাবুগঞ্জ অঞ্চলের আলোচিত রাজাকার শুক্কুর আলীর বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। বরিশালের বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান ওমর, মহিউদ্দিন মানিক, আব্দুল মান্নান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, আমির হোসেন আমু, জাহাঙ্গীর কবির নানকের সাথে ওহাব খানের সুসম্পর্ক ছিলো বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। তারা বলেন, বরিশালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন, এমন মানুষ যারা আছেন কিংবা তার সমসাময়িক গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা, যারা ওহাব খানকে কাছ থেকে দেখেছেন এমন অনেকেই এখন আর জীবিত নেই। স্বাধীনতার পর ঝাপিয়ে পড়েন দেশ গড়ার কাজে। তিনি দীর্ঘদিন চাঁদপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তারই ছাত্র বর্তমান বরিশাল বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, তখন আমি ৭ম শ্রেনীর ছাত্র। একদিন ওহাব স্যার আমাদের সব ছাত্রদের ডেকে পরিত্যক্ত খেলার মাঠটি পরিষ্কার করালেন। আমরাতো মনে মনে খুব ক্ষুব্ধ হলাম। দুইমাস পরে দেখি ঐ মাঠে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। টানা তিনবছর স্যার ঐ মাঠে আলুরসহ অন্যান্য ফসলের চাষ করেন এবং ঐ ফসল বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি স্কুল ভবন নির্মাণ করেন। এটাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ওহাব খানের ভিন্নতা ছিলো। তিনি ১৯৮৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হন। অগাধ দেশপ্রেম বুকে ধারন করে বাবুগঞ্জ অঞ্চলের উন্নয়নের কাজ করার পথে হঠাৎ ১৯৮৯ সালের ১৫ আগস্ট উপজেলা চত্বরে আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পরম মমতায় নিজ হাতে সাজানো উপজেলা পরিষদের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিধবা হন স্ত্রী খালেদা ওহাব। স্বামীর দেশপ্রেম, বাবুগঞ্জ অঞ্চলের মাটি ও মানুষের দায়বদ্ধতা আর ভালবাসার প্রতি সম্মাণ জানাতে আজও ঝাপিয়ে পড়েন স্ত্রী খালেদা ওহাব। প্রতি বছর বিনম্র শ্রদ্ধায় পালন করেন আধুনিক বাবুগঞ্জের রুপকার, দক্ষিণাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওহাব খানের মৃত্যুবার্ষিকী। বীর সেনানীর দেশপ্রেমের আলো ছড়িয়ে পড়ুক গোটা অঞ্চলে, ফের জাগ্রত হোক দেশ, মাটি আর মানুষের প্রতি ভালবাসা। তথ্যসূত্রঃ আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক আজকের পরিবর্তন। লেখকঃ প্রিন্স তালুকদার, প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওহাব খানের শ্যালক।