মোহাম্মদ সাদউদ্দিন।

আজ ২৯ আগস্ট।১৯৭৬ সালের এই দিনটিতে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল মারা যান। নজরুল ইসলামের ৪৭তম প্রয়াণ দিবস।১৯৭৬ সালের এই দিনটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে কাজী নজরুল ইসলাম শেষ নি: শ্বাস ত্যাগ করেন।অবশ্যই কাজী নজরুল ইসলামের মানসিক মৃত্যু ঘটেছিল ১৯৪২ সালেই।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে আকাশবানীতে ” রবিহারা” কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে তার জীব আড়ষ্ট হয়ে যায়।হারিয়ে ফেলেন বাকশক্তি।নানান চেষ্টা করেও তিনি আর তার বাকশক্তি ফিরে পাননি।আর কলমও সচল হতে পারেনি। সেই যে জীবন -মৃত্যুর মধ্যেই নজরুলকে কলকাতায় কাটাতে হয়েছে কখনো উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের টালা পার্কের বাড়িতে।অথবা কখনো পার্কসার্কাস এলাকার ক্রিস্টোফার রোডের বাড়িতে।সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্হপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি করে নিয়ে যান বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ২৪ মে।ঢাকার ধানমন্ডিতে তাকে বাড়ি সহ সর্ব সময়ের সেবা যত্ন করার সব ব্যবস্হা করে দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এনিয়ে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, আমাদের অভিমান থাকতে পারে।কিন্তু বাংলাদেশের আবেগের দাম দিতে হবে। সত্যিই, একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাষ্ট্র বাংলাদশে তাকে নিয়ে গেলেন।সব ধরনের ব্যবস্হা করেও তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার বাংলাদেশ।কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।আরেক রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল‌ জিয়াউর রহমান তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করেন।লাখো লাখো মানুষ সেদিন তাকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন।।তাকে বাংলাদেশ দিয়েছিল জাতীয় কবির মর্যাদা। তার জন্মদিন বা মৃত্যু দিনে ৮-১০ জন রাষ্ট্রনায়ক সামিল হন ঢাকা শহরে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের কাছে কবির সমাধিস্হল আজ সরকারী পর্যটন ক্ষেত্র। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের শ্রদ্ধা বর্ষিত হয় নজরুল -সমাধিতে।

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব অনেকটাই জ্যৈষ্ঠের ঝড়ের মতো।অনেকটা ধূমকেতুর মতোই আবির্ভাব।এক ” বিদ্রোহী” কবিতা লিখেই তিনি সবার কাছে‌ হয়ে যান ” বিদ্রোহী” কবি হিসাবে। এই কবিতাই তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।আর এবছর সেই ” বিদ্রোহী” কবিতার জন্মের ১০১ বছর।আর প্রকাশের ১০০ বছর।কবিতাটির জন্ম হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের‌ শেষ সপ্তাহে কলকাতার ৩/৪সি তালতলা লেনে।প্রকাশিত হয়েছিলো প্রথম ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে বিজলী পত্রিকায়।তারপর মোসলেম ভারত, প্রবাসী, বসুমুতি, ধুমকেতু সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পরপর প্রকাশিত হয় যা একটা নজিরবিহীন ঘটনা।

শতবর্ষ পরেও এই বিদ্রোহী কবিতা আজো সমানভাবেই প্রাসঙ্গিক।হয়তো হাজার বছর পরেও সমানভাবেই প্রাসঙ্গিক থাকবে। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মীয় মিথ সফলভাবে পরিবেশিত এই কবিতায়।শুধু একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নয়।এই কবিতা যেন একটা গণজাগরণের গণকন্ঠ।বাংলা সাহিত্যে নজরুলের‌ আগমন যেন জ্যৈষ্ঠের ঝড়ের মতো।

১৯১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কাজী নজরুল ইসলাম চলে যান সেনাবাহিনীতে।৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দেন।ট্রেনিং শেষে করাচিতে এলেন।কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হলেন।দুর্ভাগ্যের বিষয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাঙালি পল্টন ভেঙে যায়।করাচিতে থাকাকালীন ” বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী” মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন সম্পাদিত”সওগাত ” পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে(১৩২৬-বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা)। প্রথম প্রকাশিত কবিতা ” মুক্তি”।

এটি বের হয় কাকাবাবু মুজফফর আহমেদ সম্পাদিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যায়।বাঙালি পল্টন ভেঙে গেল।অত:পর নজরুল ১৯২০ সালে করাচি থেকে ফিরে এলেন কলকাতায়।কলকাতার শ্যামবাজারের রমাকান্ত বসু রোডে বন্ধু শৈলজানন্দের মেসবাড়িতে ওঠেন। কয়েকদিন থাকার পর চলে আসেন ৩২ নম্বর কলেজস্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার অফিসে।

এখানেই মুজফফর আহমেদের সঙ্গে তার পরিচয়।তারপর নজরুলের কলম দুর্বার গতিতে চলে।১৯২০–১৯৪২ সাল পর্যন্ত নজরুল ছিলেন সৃষ্টিশীল। তারপর তার অগ্নিবীণা , প্রলয় শিখা, বিশের বাঁশি, ভাঙার গান, দোলন চাঁপা, সিন্ধু হিন্দোল , ছায়ানট, সহ ১৮ টি কাব্যগ্রন্হ, নাটক , উপন্যাস, গল্পগ্রন্হ,,প্রবন্ধগ্রন্হ মিলে নজরুল দিয়ে গেলেন বিশাল সৃষ্টিসম্ভার।তিনি দিয়ে গেলেন সাড়ে পাঁচ হাজার গান।সাহিত্যের সব শাখায় ছিল তার অবাধ বিচরণ।

নজরুল‌ শুধু বিদ্রোহী কবি নন।তিনি পূর্ণমাত্রায় বিপ্লবী কবি, প্রতিবাদের কবি, পূর্ণ স্বরাজের কবি, দিন বদলের কবি, সমাজবদলের কবি, রোমান্টিক কবি, প্রেমের কবি।কী নন নজরুল? তিনিই তো একজন যথার্থই সম্প্রীতির কবি। এই কবি যুগ যুগ জিও। নজরুল অমর রহে।