চলমান সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় সমাজাতিন্ত্রক দল জেএসডি। সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় এ প্রস্তাব দেয়া হয়। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) উদ্যোগে ‘জাতীয় সরকার’ শিরোনামে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভার শুরুতেই জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রবের পক্ষে জাতীয় সরকারের একটি লিখিত প্রস্তাবনা তুলে ধরেন দলটির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।

লিখিত প্রস্তাবনায় বলা হয়, বর্তমান শাসন প্রক্রিয়া ও সমাজদেহে যে গভীর ক্ষত এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে- গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতীয় নৈতিক শক্তির পুনরুজ্জীবন করে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক একটি নৈতিক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা। জাতীয় সরকারের গঠন, রূপরেখা ও মেয়াদকাল ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।

জাতীয় সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এর ভিত্তিতে রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি প্রণয়ন করা, সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে সংবিধানের আওতায় প্রতিস্থাপন করা, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজবন্দিদের মুক্তি প্রদান করা এবং সকল গায়েবি মামলা প্রত্যাহার করা, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা, নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

জেএসডির পক্ষ থেকে জাতীয় সরকার গঠনের জন্য ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।সভাপতির বক্তব্যে জেএসডি আ স ম রব বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আমরা ১৯৭২ সালে ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম।

কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করায় গত পাঁচ দশক ধরে জনগণ অভ্যন্তরীণ পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে। স্বাধীনতার আকাঙ্খা ভিত্তিক গণতান্ত্রিক, নৈতিক ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আবারও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ‘জাতীয় সরকার’ এর প্রস্তাবনা উত্থাপন করছি।

তিনি বলেন, এই চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয় সরকার গঠনকে মৌলিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে মনে করছি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় সরকার গঠন করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এই প্রস্তাবনা রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, বুদ্ধিজীবীসহ পেশাজীবি, সামাজিক- সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের সকল অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করার উদ্যোগে সবাইকে মৌলিক রাজনৈতিক কর্তব্য সম্পাদনে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

আলোচনা সভায় বাংলাদেশ বিল্পবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দেশের ১৭ কোটি মানুষকে ঠেলতে ঠেলতে সরকার যেখানে নিয়ে গেছে তারা কি আত্মসমর্পণ করবে? নিশ্চয়ই না। তারা সরকারের এই ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। প্রতিরোধ করবে। এদেশের মানুষকে আজকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশের জন্য, দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য। আজকে জেএসডির পক্ষ থেকে জাতীয় সরকারের যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সাধারণভাবেই আমাদের এই প্রস্তাবের প্রতি নৈতিক সমর্থন রয়েছে।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী বলেন, যারা আজকে এই সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কার, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বিষয়ে একমত, সেই দলগুলোর অতিদ্রুত ঐক্যবদ্ধ একটা সংগ্রামের ক্ষেত্র গড়ে তোলা দরকার। পরিবেশ এমন তৈরি করা দরকার যাতে বিএনপিও এই সংস্কারে সম্মিলিত হতে বাধ্য হয়। কারণ বিএনপি’র জন্য একটি সুবিধাজনক অবস্থা হচ্ছে আরেকটি নির্বাচন। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের সুবিধাজনক হচ্ছে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং স্থায়ী ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা।

গণ অধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নূর বলেন, বর্তমান যে সঙ্কট চলছে আমরা মনে করি এ সংকট উত্তরণে অন্তত পক্ষে দুই বছরের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় সরকার হতে পারে। যাদের কাজ হবে- সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো গণবিরোধী আইনগুলো বাতিল করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন- গণফোরামের (একাংশ) সভাপতি মোস্তফা মহসিন মন্টু, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের এডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম, জেএসডির এডভোকেট ছানোয়ার হোসেন তালুকদার, সিরাজ মিয়া প্রমূখ।