চা শ্রমিক সন্তান সন্তোষ চাকরি পেতে যাচ্ছেন

তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর পাস করা মৌলভীবাজারের সেই চা শ্রমিক সন্তান সন্তোষ চাকরি পেতে যাচ্ছেন। আগামী রবিবার মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সন্তোষকে। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিফাতউদ্দিন এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তার চাকরির খবর শুনে খুশিতে আত্মহারা তার মা। ছেলের চাকরি হলে অবশেষে সুখের দেখা পাবেন তিনি।

গত বুধবার সকালে সরকারি খাদ্য সহায়তা নিয়ে সন্তোষদের বাড়িতে যান তিনি। কমলগঞ্জের ইউএনও সিফাতউদ্দিন বলেন, ‘সংবাদ প্রকাশের পর মৌলভীবাজারের ডিসি স্যার আমাকে এই মা-ছেলের ব্যাপারে খোঁজ নিতে বললেন। গতকাল তাঁদের বাসায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে চালডালসহ বেশ কিছু খাবার দিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর মায়ের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তাও দিয়েছি। সন্তোষকে আপাতত খণ্ডকালীন কোনো চাকরি দেওয়া যায় কি না, সেই চেষ্টা করছি। আশা করছি, আগামী রবিবার সুখবরটা দিতে পারব। ’

এর আগে আনোয়ার গ্রুপের পক্ষ থেকেও সন্তোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) ও ইউনিট এইচআর (সিমেন্ট ডিভিশন) প্রধান মনোজ কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা সন্তোষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাঁর জন্য একটা চাকরির সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। বিষয়টি তাদের বিবেচনাধীন।’

মৌলভীবাজারের শমসেরনগরে ফাঁড়ি কানিহাটি চা বাগানের এক শ্রমিক পরিবারে জন্ম সন্তোষ রবিদাস অঞ্জনের। জন্মের মাস ছয়েকের মাথায় বাবাকে হারিয়েছিলেন। মা কমলি রবিদাস চা বাগানের শ্রমিক। তখন মজুরি পেতেন দৈনিক ১৮ টাকা। সেই সময় ছেলেকে অন্যের বাসায় রেখে তিনি চলে যেতেন চা বাগানে।
ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন সন্তোষ। ২০১৩ সালে ভর্তি হন ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে। সন্তোষের মায়ের মজুরি ছিল তখন ১০২ টাকা। তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ছেলের ভর্তির টাকা, ইউনিফর্ম আর বই-খাতা কিনে দিয়েছিলেন। ২০১৪ ডিসেম্বরে ছিল সন্তোষের এইচএসসির নিবন্ধন। তাঁর মা কমলি রবি দাস তখন ৫০ টাকার একটি নোট দিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন, ‘দেহি, কেউ ধার দেয়নি রে, বাপ। ’

কলেজের এক শিক্ষকের কাছ থেকে ধার নিয়ে সেবার নিবন্ধন ফি দেওয়া হয়। এইচএসসির পর ভর্তি পরীক্ষার কোচিং। কমলি তখন আবার ঋণ নিলেন ব্যাংক থেকে। লোনের কিস্তি পরিশোধে বাসা থেকে অনেক দূরে গিয়ে বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এভাবে খেয়ে না খেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে পড়ার সুযোগ পেলেন সন্তোষ।মা-ছেলের এই সংগ্রামের গল্প নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে তা ফেসবুকে রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছে এটি। প্রতিবেদনটি শেয়ার দিয়ে অনেকে এই মাকে ‘স্যালুট’ জানিয়েছে।

ছেলের চাকরি পাওয়ার আশ্বাসে সন্তোষের মা বলেন, ‘ ওর কথা লোকে বইলছে দেখে একটু ভালো লাগিছে। বাচ্চা (ছেলে) যদি ভালা কোনো রুজি (চাকরি) পায়, তাহলে আমার সুখ অইবো।সন্তোষ রবিদাস বললেন, ‘জন্মের পর থেকেই দেখেছি মায়ের নিরন্তর জীবন সংগ্রাম। এখনো দৈনিক ১২০ টাকা মজুরিতে সকাল-সন্ধ্যা খাটতে হয় মা’কে। এত কষ্টের পরও মা আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। চাকরি হলে আমাদের কষ্টের কথা তুলে ধরার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।