আরিফ আহমেদ,  বিশেষ প্রতিবেদক

২০০ বা ৩০০ বছর নয়, হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী বরিশালের চাঁদপুরা ইউনিয়নের গজনীর দিঘীটি একটু যত্ন পেলেই হতে পারে পর্যটন আয়ের উৎস। নবাবী বা জমিদারী সময়ে নয়, সুলতানী আমলের নিদর্শন হিসেবে বরিশালে এখনো টিকে আছে এই ঐতিহাসিক জলপুকুর। গ্রীষ্মের খরতাপে চারিদিকে যখন পানি শুকিয়ে যায়, তখনও এই দিঘীর জলে ১৪ হাত পানির গভীরতা থাকে। এটা আজো সভ্যতার বিস্ময় বলে স্বীকার করেন স্থানীয় প্রশাসন।

সুলতানী আমলে গজনীর শেষ সুলতান সুলতান মাহমুদ এর শাসনামলে একদল ইসলাম ধর্ম প্রচারকারী (স্থানীয় ভাষায় যাদের আকন, আখন্দ বা আহঞ্জী বলা হয়।) এসে তৎকালীন বঙ্গ বা বাঙাল মূলুকের কয়েকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যান। তাদের একটি দলের বজড়া ভিড়েছিলো ঐ সময়ের চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যে। যতদুর জানা যায়, চন্দ্রদ্বীপে তখন সেনদের রাজত্ব চলছিল। লক্ষ্মণ সেনের পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন ১২০৬ খ্রিঃ হতে ১২২৫ খ্রিঃ পর্যন্ত এখানে রাজত্ব করেন। গৌড় হারিয়ে তারা বিক্রমপুরে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিক্রমপুরে রাজধানী নিরাপদ ছিল না। তাই মুসলমানদের ভয়ে তারা রাজধানী মাঝে মাঝে চন্দ্রদ্বীপে স্থানান্তরিত করতেন। একবার কেশব সেন লক্ষ্ণৌর সুলতানের ভয়ে চন্দ্রদ্বীপে পালিয়ে ছিলেন। কেশব সেনের একখানা তাম্রশাসনপত্র চন্দ্রদ্বীপে উত্তর-পূর্বভাগে অবস্থিত ইদিলপুর বা উত্তর শাহবাজপুরে পাওয়া যায়। ইদিলপুর তাম্র শাসন পত্রে মেহেন্দিগঞ্জ থানার লতা ও ঘোড়াঘাট গ্রামের উল্লেখ আছে। এসব তাম্র শাসন পত্র এবং চন্দ্রদ্বীপে প্রাপ্ত পাল ও সেন আমলের দেব-দেবীর মূর্তি প্রমাণ করে যে, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে সেন রাজবংশের কয়েকজন রাজা চন্দ্রদ্বীপ শাসন করেন। চতুর্দশ শতকের শেষ ভাগে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে চন্দ্রদ্বীপ বিপর্যস্ত হয় এবং অনেক জনপদ বিলীন হয়ে যায়। পুনরায় জনবসতি গড়ে ওঠে এবং অনেক শ্রোত্রিয় সপ্তসতী ব্রাহ্মণ, মৌলিক ও বঙ্গজ কায়স্থ এবং বৈদ্যগণ চন্দ্রদ্বীপের গৈলা, ফুল্লশ্রী, রামসিদ্দি, বাটাজোড়, মাহিলারা, লক্ষ্মণকাঠী, শিকারপুর, গোবিন্দপুর, লতা প্রভৃতি গ্রামে বসতি স্থাপন করে। ঐ সময় নতুন বসতি নিয়ে মুসলমানদের ঘাটি হয় এই গজনীদিঘী এলাকায়। চারদিকে জলরাশির মাঝে চাঁদের মতো একখন্ড ভূমিতে তারা বসত গড়ে তোলে। নাম দেয়া হয় চাঁদপুরা। কিন্তু আশেপাশে মিষ্টি পানির খুব সংকট ছিলো। এ সংবাদ গজনীর সুলতানের কাছে পৌঁছালে তিনি মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে এই দিঘিটি খনন করেন। তার নামানুসারে এই দিঘির নামকরণ করা হয় গজনীর দিঘি। যা চমৎকার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আজো ঘুমিয়ে আছে হাজারো বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক হয়ে। প্রথমে মুসলমানদের পরে হিন্দু জমিদারদের দখলে চলে যায় এই দিঘিটি। চন্দ্রদ্বীপ ও বদলে যায় বাকলা, বাকেরগঞ্জ ও বরিশাল নামকরণে। ইংরেজ শাসনামলে জমিদার প্রথার বিলুপ্তি ঘটার শেষ মূহুর্তে এই দিঘির ও সংলগ্ন এলাকা পুনরায় মুসলমানদের করায়ত্ব হয়। তৎকালীন আহঞ্জী বা আকনদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে যান সর্বশেষ জমিদার প্রফুল্ল নারায়ণ ঠাকুর। সেই থেকে এই দিঘির নিয়ন্ত্রণ ছিলো আহঞ্জী পরবর্তীত নাম তালুকদার পরিবারের হাতে।

বাতাস ফকিরের বংশধরদের একজন ধলু ফকির

বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নে অবস্থিত এই দিঘিকে ঘীরে একসময় প্রতি বছর গজনী মেলা বসতো। মেলায় ঘোড়দৌড় সহ নানান আয়োজনে অংশ নিতেন দূর দূরান্ত থেকে আগত সব শ্রেণির মানুষেরা। স্বাধীন বাংলাদেশে ৮০ এর দশকেও চালু ছিলো এই গজনীর মেলা। এখানে বাতাস ফকিরের আস্তানায় হাজার হাজার মানুষ আসতেন সেবা ও কল্যাণের আশায়। কেউবা দিঘিতে গোসল দিতেন, কেউবা মাছকে দিতেন খাবার। সেই আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত একবারের জন্যও দিঘির পানি শুকায়নি। মাছ ধরার জন্য দিঘির চারপাশে ২০টি দমকল বসিয়ে পানি সেচা হলেও শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট একটি স্থানের পানি সেচা সম্ভব হয়না বলে স্বীকার করেছেন সয়ং প্রশাসনও ২০১২ সালে দিঘির চারপাশে বাধ দিতে আসা প্রশাসন।

অথচ মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে বদলে যেতে শুরু করেছে ইতিহাস ঐতিহ্যের এই নিদর্শন। বেদখল হয়ে এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে গজনীর এই স্মৃতি। দিঘীর পাড় দখলের পায়তারায় দীর্ঘদিন একটি মহল ছিল মরিয়া। এবার তারা এটি লিজ নিয়ে সম্পূর্ণ দখলের পায়তারা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর এর সাথে যুক্ত জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষও।

এ বিষয়ে উইকিপিডিয়া বলছে, সুলতানী আমলে গজনীর কোনো এক সুলতান বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজনে এই দিঘী খনন করেন। স্থানীয় জাগীরদার বা জমিদারকে এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেন। যে কারণে এ দিঘীটির নাম গজনীর দিঘী হয়েছিল। আহঞ্জী বা ইসলাম ধর্মের প্রচারকারী হবার সুবাদে বরিশালের চাঁদপুরা ইউনিয়নের মানুষের কাছে আহঞ্জীদের আদিপিতা ইয়ারউদ্দিন আখনের গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেকটাই জমিদারদের মতো। বিচার আচার, সামাজিক যেকোনো সমস্যার সমাধানে এ অঞ্চলের মানুষেরা এখনো আহঞ্জী (বর্তমান তালুকদার) বাড়ি নির্ভর। যে কারণে গজনীর দীঘিটাও আহঞ্জীদের নিয়ন্ত্রণে দেন তদানিন্তন গজনীর সুলতান।

জনমুখে প্রচলিত আছে, পরবর্তীতে এই গজনীর দিঘীর বিশুদ্ধ পানির সুবিধা গ্রহণ করতে এখানে বাতাস ফকির নামের একজন দরবেশ আশ্রয় গ্রহণ করেন। হিন্দু জমিদার বা আহঞ্জীরা ওই দরবেশের থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুব্যবস্থা করে দিলে তাকে ঘিরে এখানে আশে পাশে বসত শুরু হয়। জমে ওঠে ধর্মীয় নানান উৎসব ও মেলা। গজনীর মেলায় নিয়মিত ঘোড়ার দৌড়ের আয়োজন হত। আর এ কারণেই মেলাটি অনেক দূর পর্যন্ত সুখ্যাতি লাভ করে। পুকুরের উত্তর পারে একটি গাছ ছিল, যেটির কষ ছিল রক্ত লাল। গাছটিতে কোপ দিলেই রক্ত বের হতো আর তা দেখতে ভিড় করত দূর দূরান্তের মানুষ। আর চমৎকার ও বিশাল নলি পানির পুকুরটির সঙ্গে রামসাগর  ও দূর্গা সাগরের তুলনা হতো। অথচ আজ মৃতপ্রায় পুকুরের দক্ষিণ পাড় পুরোটাই দখল করে গড়ে উঠেছে বসতভিটা। পূর্বপাড়ও অনেকটা বেদখল। পশ্চিম পাড়ে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বাতাস ফকিরের বংশধরদের ঘরবাড়ি।

বাতাস ফকিরের বংশধরদের একজন ধলু ফকির জানান, যদিও সুলতান মাহমুদের শাসনামলে গজনী দীঘী খনন ও এই এলাকার সায় সম্পত্তি সবটাই আহঞ্জীদের হাতেই ছিলো। কিন্তু পরে এ সবটাই হিন্দু জমিদারের আয়ত্বে দেয়া হয়। বাতাস ফকিরকে আশ্রয় হিন্দু জমিদার দিয়েছেন। আহঞ্জীরা বাঁধা দিয়েছিলেন বলে জানান ধলু। তিনি আরো বলেন, সুলতান মাহমুদ এর ভাই গজনী এই পুকুর কাটান। একই সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলেও এমন একটি পুকুর কাটিয়েছেন বলে জানান বাতাস ফকিরের বংশধর ধলু ফকির। ধলু আরো জানান, নবাব আমলে এই স্টেট চলে যায় হিন্দু জমিদারদের হাতে। তখন প্রফুল্ল নারায়ণ ঠাকুরও তার সম্পত্তির বন্দোবস্ত আহঞ্জীদের উপরই দিয়েছিলেন। ঐ সময় ১৮ শতকের শেষ দিকে বাতাস ফকির এখানে আশ্রয় গ্রহণ করে।  ১৯১৬ সালে তিনি দেহত্যাগ করেন। তার বংশের আমরা ও আহঞ্জী বর্তমান তালুকদারদেরকে প্রফুল্ল নারায়ণ ঠাকুরের সায় সম্পত্তি আট অংশ দান করে যায়। এরপর কীভাবে এটি সরকারের আর পাড়ের মানুষের ব্যাক্তিগত হলো? আহঞ্জী বাড়ীর লোকেরা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা কীভাবে এই পাড় বিক্রী করছে তা কারো বোধগম্য নয়।

স্থানীয় চেয়ারম্যান জাহিদ খান,  ইউপি সদস্য, কবির সিকদার, মাজহারুল ইসলাম কালাম, কালাম মীরা প্রমূখদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে গ্রামবাসীর দাবী, এই গজনী দীঘি বরিশালের তথা দেশের একটি ঐতিহ্য। এই দীঘিটির চারপাশে দূর্গাসাগরের মতো পাকা সড়ক তৈরি হলে পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হবে এখানে। সাথে যদি টুরিস্ট পুলিশের একটি ক্যাম্প করে ভ্রমণকারীদের জন্য চলাচল নিরাপদ যায় তাহলে স্থানীয়ভাবেও আয়ের উৎস বৃদ্ধি পাবে। এটিকে পর্যটন কর্পোরেশনের আওতায় নিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কার ও ঐতিহ্য রক্ষার দাবী গ্রামবাসীর।