করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। এজন্য পরিবারের পাশাপাশি দলীয়ভাবে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি।

দলটির শীর্ষপর্যায়ের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টি সমাধানের জন্য রাজনৈতিকভাবে দলের নেতারা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। আলোচনায় খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে সমঝোতা হলেই অনুমতির জন্য দলের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন করা হবে।

দলটির স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতা  জানান, গত ২১ জুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কিছুদিনের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা ও চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বোর্ডের দেওয়া লিখিত পরামর্শগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে দেওয়া হবে।

খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে সরকার কী ভাবছে, বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও শর্ত কী, কোন দেশে পাঠানোর অনুমতি দিতে ইচ্ছুক— এসব বিষয় আলোচনায় উঠে আসবে। আলোচনায় উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে অনুমতির জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদনের বিষয়টি সামনে আসবে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান  বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সাজা স্থগিত করে তাকে মুক্তি দিয়েছিল। করোনায় আক্রান্ত হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নিতে সরকারের কাছে আবেদন করে পরিবার। কিন্তু সরকার অনুমতি দেয়নি। এখন পরিবারের পাশাপাশি দলের পক্ষ থেকে সরকারকে আহ্বান জানানো হবে।

গত বুধবার (২৩ জুন) রাতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য  বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে দল থেকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা মহাসচিব মির্জা ফখরুল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। এখন বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় তাকে বিদেশে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আলোচনা হবে।

বিএনপি কবে আলোচনায় বসবে— জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, দিন-তারিখ নির্ধারণ করে কী আলোচনা হয়? আমরা তো সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে উদ্যোগ নিয়েছি। এখন তাদের পক্ষ থেকে সময় পাওয়া গেলেই হবে।

ওই নেতা আরও বলেন, খালেদা জিয়ার লিভারের অবস্থা খারাপ বলে জানিয়েছেন তার মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসারা। তার চিকিৎসা বাংলাদেশে সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন তারা। এ চিকিৎসায় যিনি (চিকিৎসক) বেস্ট, তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। এ কারণে আমরা চাই তাকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নিয়ে যেতে। এখন সরকার যদি তাকে লন্ডনে না পাঠিয়ে অন্য কোনো দেশে চিকিৎসার জন্য অনুমতি দেয়, তাহলে সেখানেই নেওয়া হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু  বলেন, ‘স্থায়ী কমিটির প্রতিটি বৈঠকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। গত সপ্তাহের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে দলীয়ভাবে চেষ্টা করার বিষয়টি লিখিত এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা বারবার তার মুক্তি ও চিকিৎসার বিষয়ে অনুমতির জন্য সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি। কিন্তু সরকার প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে অনুমতি দিচ্ছে না।’

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ম্যাডামের চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দলের নেতাদের দেখা করার একটি প্রক্রিয়া চলমান আছে। সেটা আসলে কবে, কখন ও কোথায় হবে; তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

এদিকে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসকরা বলছেন, আমাদের কাজ হচ্ছে চিকিৎসা দেওয়া, তার শারীরিক অবস্থা কী সেটা জানানো। বর্তমানে খালেদা জিয়ার হার্ট, কিডনি ও লিভারের সমস্যা সবচেয়ে জটিল। এর মধ্যে তার হার্ট ও কিডনির কিছু চিকিৎসা করা হয়েছে। কিন্তু লিভারের চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। এ বিষয়ে অ্যাডভান্সড টেকনোলজি আছে এমন কোনো জায়গায় তার চিকিৎসার লিখিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখন রোগীর পরিবার, বিএনপি ও সংশ্লিষ্টরা ঠিক করবেন কোথায় তার চিকিৎসা হবে।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসক ডা. জাহিদ হোসেন  বলেন, হাসপাতাল থেকে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা থাকায় খালেদা জিয়াকে বাসায় নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে তিনি হার্ট, কিডনি ও লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। হার্ট ও কিডনির কিছু চিকিৎসা দেওয়া গেছে। কিন্তু লিভারের চিকিৎসার জন্য অ্যাডভান্সড যে টেকনোলোজি প্রয়োজন, সেটি বাংলাদেশে নেই। এ বিষয়ে আমাদের মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশগুলো লিখিতভাবে দেওয়া হয়েছে।তিনি আরও বলেন, এখন কোন দেশে বা কীভাবে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হবে কিংবা সরকার অনুমতি দেবে কি না, তা দেখবে তার পরিবার ও দলি।

এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম  বলেন, ‘আমরা তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে সরকারের কাছে একাধিকবার আবেদন করেছি। তারা নিতে দেয়নি (অনুমতি দেয়নি)। এখন আবার নতুন করে কিছু করছে কি না, সেটা শামীম (ভাই শামীম ইস্কান্দার) ভালো জানেন।’

বাসায় যেভাবে সময় কাটছে খালেদা জিয়ার

দীর্ঘ ৫৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ১৯ জুন রাতে গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় ফেরেন খালেদা জিয়া। সেখানে তাকে নিয়মিত দেখতে যান বোন সেলিমা ইসলাম। এর বাইরে তার চিকিৎসক দলের সদস্য ডা. জাহিদ হোসেন ও ডা. আল মামুন তাকে দেখতে যান।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া দিনের অধিকাংশ সময় শুয়ে বা হুইল চেয়ারে বসে কাটান। রাতে কিছু সময় লন্ডনে অবস্থানরত ছেলে, ছেলের বৌ এবং নাতনিদের সঙ্গে অনলাইনে কথা বলেন। তবে অসুস্থ থাকায় কথা হয় সংক্ষেপে। তার খাবার ভাই-বোনের বাসা থেকে আনা হয়। আবার বাসায়ও তৈরি হয়। তরল জাতীয় খাবারই বেশি খাচ্ছেন তিনি।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে দল বা বাইরের কেউ দেখা করতে যান কি না— জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার জানা মতে ম্যাডামকে শুধুমাত্র তার চিকিৎসকরাই দেখতে যান।