কৃপা বিশ্বাসের কবিতা |

❑অসম্পূর্ণ সত্তা
জানো তো তিমির!!
যে আকাশটায় ট্রাফিক জ্যাম নেই,
আমার হালকা শরীর আজ ডানা মেলেছিল
সেই আকাশে,
সীমান্ত পাড়ি দেওয়া কম্পিত ইচ্ছেঘুড়ি নিয়ে।
শুধুই তোমায়—
আমার মনের অঙ্কিত ক্যানভাসটার সাথে মিলিয়ে,
হালকা আকাশী, নীল রঙের ফতুয়া পরা তুমিটাকে আবিষ্কার করবো বলে।
তোমার পাশে বসে হুড তোলা রিকশায়
হালকা রোদে ছায়া ফেলে,
সমস্ত শহরটাকে সাক্ষী করার নেশায় মেতেছিল
এ মন,
এই ক্ষণস্থায়ী ঝিরিঝিরি বর্ষার রুপের সাথে,
তোমায় প্রথম দেখার আনন্দ নিয়ে ভাসবো বলে,
এই শান্ত শহরটার অশান্ত বাতাসের সাথে।
কিন্তু হঠাৎ অজানা এক নিয়তি যে বাঁধা হলো !
আমার মনের সেই খড়হীন স্রোতে।
এই বাঁধা ডিঙ্গিয়ে কী করে তোমায় ছুঁই বলো?
নীলে রাঙানো কানের দুলটা নিচে পড়ে,
এই বালু-সিমেন্টের সাথে চুরমার হয়ে মিশে গেল,
অথচ এই দুলটা তোমার স্পর্শ পেতে চেয়েছিল!
সেই গাঢ় ধূসর মেঘের শাড়িতে,
বিলীন হতে হলো নিজেকে ধূসর বাস্পের মতো,
যেখানে কিনা তোমায় লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম!
সেই খানে আজ না পাওয়া লুকিয়ে রেখে—
নীল মাখানো কাঠের চুড়িগুলোকে,
হঠাৎ যেন ঘুনপোকা ক্ষয় করতে শুরু করলো,
যারা কিনা তোমায় মিষ্টি সুরে মাতাল করতে চেয়েছিল!
কিন্তু বেলী ফুলের সুভাসীত মালাটা
তোমার মনটায় পড়িয়ে দিয়ে গেলাম,
যেটা কিনা আমার সুভাস তোমায় সবসময়
অনুভব করাবে।
আর কপালের নীল টিপটা নিজেই বয়ে নিয়ে চললাম,
কপালের মাঝে তোমায় আলতো করে আঁকড়ে রাখবো,
যতদিন না এ কপাল তুলসী পাতাতে না সাজে।
তুমিতো কৃপা নামের অর্থ জানো?
তাই আমার এই ফিরে যাওয়ার ব্যাখ্যা দিতে চাইনা।
শুধু বুঝে নিও—
অসম্পূর্ণ সত্তা কাউকে কখনো পূর্ণতা দিতে পারে না।
❑আমি সেই নারী
আমি সেই নারী
যাকে বহু বছরের পর বছর ধরে
সতীত্বের প্রমাণ দিতে এই সমাজে—
অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিতে হয়েছে।
সেই দহনে এখনো পুড়তে হয় আমায়
পরোক্ষ পুরুষ শাসিত অসাম্য চিতায়!
আমি সেই নারী
যাকে অন্নপূর্ণা নামে পূজিত করে,
চাল আর দিয়াশলাই ধরিয়ে দাও হাতে—
শত অবস্বাদের মাঝেও।
কিন্তু সেই নারীকেই কালক্রমে বাঁচতে হচ্ছে,
সেই খাবারের অবশিষ্টাংশ খেয়ে!
আমিই সেই নারী,
যাকে মা বলে,প্রকৃতি বলে, দেবী বলে—
পূজা করো তোমরা সূর্যের আলোয়।
আর রাতের অন্ধকারে ঠোঁটে রঙ মাখিয়ে,
হাতে কুপি ধরিয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখো!
আমি সেই নারী,
যাকে সন্তান দানে মেশিন বানিয়ে,
তার কাছ থেকেই আইনস্টাইন, সুভাষ, মুজিবকে উপহার নেও।
কিন্তু সেই নারীর জন্মক্ষণকে অশুভ করে
মা অপয়ার ঘৃণিত গণ্ডিতে মোড়ানো হয়েছিল!
আমি সেই নারী,
যাকে সংসারের অসময়
টিউশনির ফিস দিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়,
কখনো বা ভাইয়ের স্কুলের বই কিনতে হয়।
কিন্তু তাকেই বড় হতে হচ্ছে —
কিছু অবহেলিত শব্দের বেড়াজালে।
কী হবে এত লেখাপড়া করে?
সেইতো মহাপুরুষ নামের কাপুরুষের কথায়
মেয়ে – উঠবশ করা লাগবে তোমায়।”
কিন্তু হ্যাঁ! এমন একদিন ঠিক আসবে,
যেদিনটা সাম্যের ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয়ে,
হাতে ধরিয়ে দেওয়া সেই দিয়াশলাই দিয়েই
সমস্ত অন্যায়, অসাম্যতা, নিপিড়ন—
সমস্ত পুরুষ শাসিত প্রলয়োল্লাস হবে ধ্বংস।
নারী সত্তা হবে কলঙ্ক মুক্ত!
আর -আর তখনই আনন্দ উল্লাসে বলে উঠবো
আমি, হ্যাঁ আমিই সেই নারী।
❑আমার মা
আমার মা একজন মানানসই।
যিনি সুন্দরী মেয়ের রূপ ত্যাগী-
একজন ক্লান্তি মাখানো নারীর রূপ !
আমার মা একজন সহনশীল।
যিনি দশ মাস দশদিনের-
সমস্ত অসহনীয় কষ্টের আকাঙ্ক্ষী!
আমার মা একজন দুঃসাহসী।
যিনি সকল অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূল মুহূর্তের-
প্রহরী সাঁজে সজ্জিত আমার সমস্ত বদ্ধমূলে!
আমার মা একজন বেপরোয়া।
যিনি আমার সুখের সুর শুনতে –
পরিবার-সমাজের কটু উক্তির সর্বত্রে করে তাচ্ছিল্য!
আমার মা একজন দুঃখ লুকানো একগাল হাসির প্রতিচ্ছবি।
যিনি সকল বিষাদ এড়িয়ে চলা-
হাসি বিলানো একজন পারফেক্ট নারী!
সমস্ত কর্তব্যের পালা যখন হয় শেষ গমনে,
সমাপ্তের ইতি টানতে তিনি হয়ে অভিন্নতায় অকথ্য
নিরদ্বিধায় চলে বৃদ্ধাশ্রমের অভিমুখে!
হ্যাঁ, এটাই আমার মা!