করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে ২০২০ সালের ৯ এপ্রিল থেকেই বাংলাদেশকে (নিষেধাজ্ঞা) ‘লাল চিহ্নি তালিকা’ভুক্ত করে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটির ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্ট।

কিন্তু বাংলাদেশে সম্প্রতি কিছুদিন ধরে করোনার সংক্রমণের নিম্নগতি চলছে। এরপরও এখনো কেন যুক্তরাজ্যের ‘লাল তালিকা’য় বাংলাদেশ, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ৬২টি দেশকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ‘লাল তালিকা’ভুক্ত করেছে যুক্তরাজ্য। একইসঙ্গে দেশগুলোতে ব্রিটিশ নাগরিকদের ভ্রমণে বিধিনিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে। তবে, নতুন করে সংশোধিত তালিকা থেকে রেহাই পেয়েছে ভারত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশগুলো বাদামি তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। ফলে এসব দেশ থেকে কেউ যুক্তরাজ্যে গেলে তাদের আর হোটেল কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে না।

গভ ডট ইউকের ওয়েবসাইটে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা দেশগুলোর বিষয়ে বলা হয়েছে, কেউ ১০ দিনের মধ্যে ‘লাল তালিকা’ভুক্ত দেশ থেকে আসা-যাওয়ার সময় ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের জন্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তবে ব্রিটিশ, আইরিশ নাগরিক এবং ব্রিটেনে বসবাসের অনুমতি রয়েছে, এমন ব্যক্তিরা ‘লাল তালিকা’র দেশগুলো থেকেও যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাদের অবশ্যই যুক্তরাজ্য সরকার অনুমোদিত হোটেলে নিজ খরচে ১০ দিনের কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক। তবে, কেউ যদি নির্ধারিত হোটেলে কোয়ারেন্টিন পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে ১০ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি প্রায় ১০ লাখ ৪ হাজার ২২ টাকা) জরিমানা গুনতে হবে।

এছাড়া ব্রিটেনে ভ্রমণের আগ মুহূর্তে কনোরা পরীক্ষার সার্টিফিকেটও দেখাতে হবে। দেশটিতে পৌঁছানোর পর আট দিনের ব্যবধানে প্রথম এবং দ্বিতীয়বার অবশ্যই আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করাতে হবে।

যে কারণে লাল তালিকায় বাংলাদেশ:

করোনার উদ্বেগজনক ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টা শনাক্ত হওয়ার পর মহামারির বেড়ে যাওয়ায় ব্রিটেন ভ্রমণের ‘লাল তালিকা’য় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

গত ৯ এপ্রিল গ্লোবাল ট্রাভেল টাস্কফোর্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনার মূল মাপকাঠি হলো সেই দেশে করোনার সংক্রমণের হার, উদ্বেগজনক ভ্যারিয়েন্টের বিস্তার এবং টিকাদান কার্যক্রমের অগ্রগতি। এছাড়া এতে মহামারিবিষয়ক তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও জিনোম সিকোয়েন্সিং সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

গত ৮ জুলাই থেকে প্রায় ৫ সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশে দৈনিক করোনা সংক্রমণের হার প্রায় ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশ ছিল। অন্যদিকে, টিকা দেওয়ার হার বাড়ানোর পরও করোনায় দৈনিক মৃত্যু ২০০ জনের ওপরে ছিল। এসবই ভ্রমণকারী ও পর্যটকদের জন্য কোভিড পজিটিভ হওয়ার উচ্চ আশঙ্কা নির্দেশ করে। যে কারণে বাংলাদেশ ‘লাল তালিকা’য় স্থান পেয়েছে।

বাংলাদেশকে (ভ্রমণ নিষেধজ্ঞা) ‘লাল তালিকা’ভুক্ত করে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ বিষয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমিনিক রাবের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে ড. এমএ মোমেন বলেন, ‘‘দেশে করোনা সংক্রমণ কমে আসার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেন ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ‘লাল তালিকা’র বাইরে রাখার অনুরোধ করেছি।’ তিনি বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশে ব্যাপকভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি চলছে। করোনা সংক্রমণ ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু ব্রিটেন ‘লাল তালিকা’ভুক্ত করায় বাংলাদেশের প্রায় সাত হাজার ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আটকা পড়েছেন। এই কারণে বাংলাদেশকে ‘লাল তালিকা’ভুক্ত দেশগুলোর বাইরে রাখার বিষয়টি ব্রিটেনের বিবেচনা করা উচিত।’’

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের হার কমে যাওয়া এবং ব্রিটেন ভ্রমণের ‘লাল তালিকা’ থেকে বের হতে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সম্পর্কে আমিও জানি। তবে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়মিত পর্যালোচনার ভিত্তিতে ব্রিটেনের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে এবং বাংলাদেশে করোনার জেনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ডাটা নিয়মিত হালনাগাদের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার ‘লাল তালিকা’র বিষয়টি বিবেচনা করবে।’’

একজন স্বাস্থ্যবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশে করা করোনার আরটি-পিসিআর টেস্টে শুধু করোনা নেগেটিভ বা পজেটিভ উল্লেখ থাকে। সেখানে রোগী এই ভাইরাসটির কোন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত সাধারণত তা উল্লেখ থাকে না। ফলে দেশে কোন ভ্যারিয়েন্টের রোগী কত, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন।

দেশে গত কিছুদিন ধরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের নিম্নগতি থাকার পর এখনো কেন যুক্তরাজ্যে লাল তালিকায় বাংলাদেশ, এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতদরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল আলম  বলেন, ‘‘কোনো দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনার মূল মাপকাঠি হলো সেই দেশের করোনার সংক্রমণের হার। আমাদের দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার নিম্নগতি। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সংক্রমণের হার ১০ শতাংশের নিচে। তবে সাধারণত (ভ্রমণ নিষেধজ্ঞা) ‘লাল তালিকা’ মুক্ত হতে হলে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে নামতে হয়।’’ যুক্তরাজ্যে ‘লাল তালিকা’য় বাংলাদেশ থাকা না থাকা দেশরি পলিসিগত বিষয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here