রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চার সপ্তাহ পর সরকারের ঘোষণা দিয়েছে কট্টরপন্থি সংগঠন তালেবান। তবে পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠন না করে গঠন করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তালেবান নেতা মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে এ সরকারের প্রধান করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ সেপ্টেম্বর) তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এ তথ্য জানিয়েছেন।

এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সিরাজউদ্দিন হাক্কানি তালেবানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মোল্লা হাসান আখুন্দ তালেবান নেতৃত্বের ‘রেহবারি শুরা’র প্রধান। বর্তমানে তালেবানদের সর্বশক্তিশালী সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংস্থা এই রেহবাড়ি শুরা। তাদের পরামর্শ মেনেই চলে তালেবান প্রধান আখুন্দজাদ। তালিবানরা জানিয়েছে, গত ২০ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে রেহবাড়ি শুরার প্রধানের দায়িত্ব সামলাচ্ছে সে। হাসান আখুন্দ জন্মেছিলেন দেশটির কান্দাহারে, যে প্রদেশে জন্ম হয়েছিল তালেবান গোষ্ঠীর। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে যে মূল ৩০ জনকে নিয়ে তালেবান গোষ্ঠীর পথ চলা শুরু হয়েছিল, তাদেরই একজন হাসান আখুন্দ। সেইসঙ্গে তালেবানের সশস্ত্র আন্দোলনেরও তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তবে আন্তর্জাতিক মহরে তাকে তালেবানের একজন গড়পড়তা নেতা হিসেবে দেখা হয়। তবে জাতিসংঘের সন্ত্রাসীর তালিকায় তাঁর নামও রয়েছে। মার্কিন দখলের আগের তালেবান সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হাসান। তারপর উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

সরকারপ্রধান হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা সেই আব্দুল গনি বারাদারকে করা হয়েছে সরকারের উপপ্রধান। তিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তালেবানের যে ক’জন কর্মকর্তা কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা চালিয়েছে তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম।

তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তালেবানের উপনেতা সিরাজুদ্দিন হাক্কানি।

তার মাথার মূল্য ৫০ লাখ ডলার ঘোষিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের ওয়েবসাইটে। হাক্কানী নেটওয়ার্ককে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তালেবান প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুব হয়েছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী হয়েছেন হেদায়েতুল্লাহ বদরি। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আমির খান মুত্তাকি এবং সরকারের দ্বিতীয় উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মোল্লা আবদুল সালাম হানাফি।

তবে প্রাথমিক প্রাথমিক অনুযায়ী, অ-তালিবানি কোনও মুখকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকারে ঠাঁই দেয়নি তালেবান। যে দাবি আন্তর্জাতিক মহল থেকে তোলা হচ্ছিল।

সংবাদসংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে পুরনো মুখদেরই প্রাধান্য দিয়েছে তালেবান। মার্কিন সেনার হাতে পতনের আগের কয়েক বছরে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারে প্রধানমন্ত্রী ছিল হাসান। বরাদর আবার আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে দোহায় যে আলোচনা চলেছিল এবং চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল, তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল। সংবাদসংস্থা এএনআই আবার জানিয়েছে, তালিবানের মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যমে টোলো নিউজ বলেছে যে মৌলবী হান্নাফি হয়েছে দ্বিতীয় ডেপুটি নেকা।

কাবুল দখলের পর তালেবান বলেছিল, মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ত্যাগের পর তারা সরকার গঠন করবে। ক্ষমতা দখলের পর তিন সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তালেবান আনুষ্ঠানিক কোনো সরকার গঠন করতে পারেনি। অবশেষে চার সপ্তাহ পর সরকার ঘোষণা করলেও তা পূর্ণাঙ্গ সরকার নয়।

তালেবানের ভেতরে বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যকার মতভেদই নতুন সরকার গঠনে বিলম্বের প্রধান কারণ। ​আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠনে বিলম্বের মূলে রয়েছে তালেবানের মধ্যকার তিনটি গোষ্ঠীর মতভেদ। এগুলো হলো তালেবানের দোহা ইউনিট, হাক্কানি নেটওয়ার্ক ও কান্দাহারভিত্তিক গোষ্ঠী।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, তালেবান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে দেশের ভগ্নদশা অর্থনীতি চাঙ্গা করা, দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পর্ক স্থাপন করা।

কাবুল ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখলের পরই সম্ভাব্য সরকার নিয়ে তালেবান বলেছিল, তারা ২০ বছর আগের অবস্থানে আর নেই। এবার অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করা হবে, যেখানে থাকবে সবার অংশগ্রহণ। সরকারে থাকবে নারী প্রতিনিধিত্বও।

তবে সময়ের সঙ্গে সুর পাল্টায় তালেবান। জানায়, এককভাবেই সরকার গঠন করবে তারা। রাখা হবে না কোনো নারী নেতৃত্বও। অন্তবর্তী সরকারেই এর প্রতিফলন দেখা গেল।

এদিকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকারের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই মঙ্গলবার কাবুলে তালেবান এবং পাকিস্তান-বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। তাতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালিয়েছে তালিবান। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানায়, তালেবানের হাতে আফগানিস্তান চলে যাওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাস্তায় নামেন শয়ে শয়ে নারী-পুরুষ। মিছিলে নারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো ছিল। তাঁরা কাবুলের রাস্তায় বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। করেন মিছিল। সঙ্গে স্লোগান ওঠে, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ এবং ‘পাকিস্তানের মৃত্যু (হোক)’। যে পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক আছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হয়। আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে তালেবানকে পাকিস্তান সমর্থনও করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও সেই অভিযোগ স্বীকার করেছে তালেবান।

গত ১৫ আগস্ট তালেবানের কাছে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের পতন হয়। এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা ফের তালেবানের হাতে যায়। স্থানীয় সময় ৩০ আগস্ট রাতে কাবুল ছাড়ে শেষ মার্কিন সেনা। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here