উন্নয়নের বরিশাল পাঁচঃ নদী তীরে বাড়ছে মাদকের চাষ

আরিফ আহমেদ
কীর্তনখোলা। বরিশালের   প্রধান নদী। নদী তীর ঘেঁষা শহরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে লঞ্চঘাট থেকে মুক্তিযুদ্ধ পার্ক ও ত্রিশ গোডাউন এলাকায় মানুষের ভিড় প্রতিদিন বিকেলে।  কিন্তু সন্ধ্যার পরই এ ভিড় বদলে যায় মাদকাসক্তদের আখড়ায়। গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের প্রভাবে ভারী হয়ে ওঠে এখানের বাতাস। ভদ্রলোক ও সভ্য সমাজের মানুষগুলো গাঁ বাঁচাতে এই এলাকা থেকে কেটে পরেন। ভীর করেন টিনেজার ও উঠতি যুবাদের দল।
নদী তীর ঘেঁষা সুন্দর সান বাধানো পায়ে চলা পথ চরকাউয়া খেয়াঘাট থেকে চলে গেছে দক্ষিণ দিকে মুক্তিযুদ্ধ পার্ক হয়ে আরো দক্ষিণে কেডিসি পর্যন্ত। এরপর কিছুটা সংযোগহীন কাদামাটির পথ পেরোলেই ত্রিশ গোডাউন এলাকার মনোরম পরিবেশে নদীর আদর। প্রশাসন চাইলে এই পথ আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ঘুরে আসতে পারে অপসোনিন ও খানসন্স এর দখলকৃত চর এলাকা হয়ে আটঘর কুড়িয়ানার বৃহত্তর পেয়ারা বাগানের সীমানা।
চরকাউয়া খেয়াঘাট থেকে নদী তীরের তিনফুটের এই পথের পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বস্তিঘর।  এসব ঘরের মেয়েদের সাথে টিনেজার যুবাদের সখ্যতা যেন বন্ধুর মতো। পথে যেতে হঠাৎ মশকরা ছলে হাত বাড়িয়ে দিয়ে টাকা ও মাদকের লেনদেন বেশ স্পষ্ট এখানে সন্ধ্যার আলোছায়ায়।
পুলিশের সাদা পোশাকের ছুটোছুটি চোখে পড়ে মাঝেমধ্যে।  দু’চারজনকে তারা হাতেনাতে আটকও করেন গাঁজার পোটলাসমেত। তবে তা নিতান্তই আইওয়াশ বৈ আর কিছু নয়। ইয়াবাসহ আরো কতশত মাদকের বিচরণ আড়ালেই থেকে যায়। কারণ রাজনৈতিক প্রভাবিত এই আখড়া থেকে তাদেরকেও বখড়া দেয়ার অভিযোগ আশেপাশের ব্যবসায়ীদের।
বরিশাল শহরের নদী তীর ঘেঁষা এই চমৎকার সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে শুধু মাত্র সু পরিকল্পনা ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে। মাদকের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতেই নদী পারে কোনো উন্নয়ন হতে দেয়না রাজনৈতিক নেতারা সয়ং। এমনটাই বলেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি প্রায় সবাই।
জানা যায়, বেশিরভাগ সময় এখানে বিএনপির শাসন চললেও বর্তমানে চলছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শাসন। শহরের মানসম্পন্ন যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে তা প্রয়াত সাংসদ নাসিম বিশ্বাস ও মেয়র শওকত হোসেন হিরণ এর শাসনামলে। এরপর মজিবর রহমান সরোয়ারও চেষ্টা করেছেন কিছুটা উন্নয়নের তবে তা শুধুই সিটি করপোরেশনের সীমানা বৃদ্ধি ও সড়কের। মেয়র  আহসান কামাল নির্বাচিত হবার পর থেকেই সরকারের রোষানলে ছিলেন। তারপর বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এর শাসনামল চলছে এখনো।
বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে নদী তীর ধরে এই পথ চলে গেছে ত্রিশ গোডাউন হয়ে এঁকেবেঁকে কীর্তনখোলা ব্রিজ হয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কিম্বা পুরাতন দপদপিয়া ফেরীঘাট পর্যন্ত।
 প্রায় পাঁচ-সাত কিঃমিঃ এই পথে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করলেই তৈরি করতে পারেন চমৎকার পর্যটন উপকরণ। স্টিমারঘাট,  স্প্রিটবোর্ট ঘাট, জাহাজঘাটগুলোর সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়াও বান্দরোডের কেডিসি ঘাট ও ত্রিশ গোডাউন এলাকা হতে পারে পর্যটন আয়ের উৎস। অত্যাধুনিক ডকইয়ার্ড এর অভাবে ঢাকা থেকে যন্ত্রাদি ভাড়া করে এনে কাজ করতে হয় এখানের ডক মালিকানা। অথচ ডকইয়ার্ডের জন্য রয়েছে যথেষ্ট সম্ভাবনা এই নদী তীর এলাকায়। উৎপাদনশীল শিল্প প্রতিষ্ঠান কিছুই নেই এই অঞ্চলে।
পথিমধ্যে যদিও মুক্তিযুদ্ধ পার্ক নামে কিছুটা স্বস্তির স্থান সাজানো রয়েছে তবে তা মলিন করে দেয় দুপাশের অসংখ্য বস্তি ও খুদে দোকান। এই বস্তিগুলোর মেয়েদের ব্যবহার করেই চলছে এখানে মাদকের বিচরণ।
নদীর গাঁ ছুঁয়ে বিপদজনক ভাবে গড়ে ওঠা এরকম প্রায় তিন হাজার বস্তিঘরে  কম হলেও ত্রিশ হাজার মানুষের বসবাস এখানে। এদের কেউ নদী ভাঙা কোনো গ্রাম থেকে এসেছেন,  বেশিরভাগ ভোলার চরাঞ্চলের বাসিন্দা। কেউ আবার নিষক কাজের প্রয়োজনে কাছাকাছি কোনো গ্রাম থেকে এসে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় আশ্রয় কিনেছেন এই নদীতীরের খাসজমিতে।
এদের ঘীরেই গড়ে উঠেছে শহরের মাদকের বড় নেটওয়ার্ক।
একটু দৃষ্টি দিলেই এ দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে সন্ধ্যার পরের ত্রিশ গোডাউন ও মুক্তিযুদ্ধ পার্কের যুব আড্ডাগুলোতে দৃষ্টি দিলেই।
ভয়াবহ মাদকের প্রভাব ক্রমশ ধ্বংস করে দিচ্ছে যুব সমাজের মেধা ও মননকে।
এ দৃশ্য শুধু বরিশালে নয়, সারাদেশে একই চিত্র। পার্থক্য শুধু এটুকু এখানে যুব নেতাদের নেতাজীরাও মাদকাসক্ত বলে জোর প্রমাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারপাশে। অথচ শিল্পীতনগরী হওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা এই বরিশালের মাটিতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here