আরিফ আহমেদ।
কীর্তনখোলা নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা বরিশাল নৌ বন্দরের দুইপাশই অবরুদ্ধ। একপাশে চর ও ছোটখাটো নৌযানের চলাচল।  অন্যপাশ আটকে আছে চরকাউয়া বা কাউয়ারচর খেয়াঘাটের দাপটে। যে কারণে ঢাকা থেকে আসা বড় লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজগুলোকে চলাচল করতে হয় খুবই সতর্কতার সাথে।
একদিকে চরে আটকে যাওয়ার ভয়, অন্যদিকে ধাক্কা লেগে ছোট লঞ্চ বা নৌকার ক্ষতি হবার আতঙ্কিত ঘাটে ভেরা চালকের। প্রায়শই এ নিয়ে বড় লঞ্চের চালক বা চুকানিদের সাথে ছোট লঞ্চ,  নৌমাঝি কিম্বা ঘাট শ্রমিকদের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে।
কীর্তনখোলা নদীর উত্তর পাশের চর এলাকায় ক্রমশ পলি জমেই চলেছে। সেখানে এখন ঘন বসতীও গড়ে উঠেছে। যে কারণে ড্রেজিং ব্যবস্থা বন্ধ।  সব লঞ্চ এখন নাব্যতা সংকট এড়াতে চরকাউয়া ঘাট এলাকা দিয়ে চলাচল করছে যা নৌকা ও ট্রলারের জন্য বিপদজনক।  একইসাথে  দ্রুত ভাঙতে শুরু করেছে চরকাউয়া এলাকার নদী পাড় এলাকা।বরিশাল নদী বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কোনো মতামত বা কার্যক্ষমতা নেই। তাদের কাছে কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে গেলেই তার ঢাকা হেড অফিস দেখিয়ে দেন।অথচ এই বরিশাল নদী বন্দরের রয়েছে গর্বিত ইতিহাস।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোগল সাম্রাজ্যের পর থেকে বরিশাল নদী বন্দরটির একটি রেকর্ড অস্তিত্ব রয়েছে। পূর্বে এই বন্দরটি “গিরি-ই-বান্দর” নামে পরিচিত ছিলো। এটি একটি নদী বন্দর যা লবণ, মশলা এবং কাঠের ব্যবসায়ের জন্য পরিচিত ছিল। ১৮৬৯ সালে নগর কমিটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে এবং ১৮৭৬ সালে পৌর মর্যাদা অর্জনের পরে ব্রিটিশ শাসনামলে এটি বরিশাল বন্দরে রূপান্তরিত হয়। ১৮৮০ এর অল্প আগেই বরিশালের নদীপথে স্টিমার চলাচল শুরু করে। ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল সেন্ট্রাল ফ্লোটিলা কোম্পানি বরিশাল ও খুলনার মধ্যে নিয়মিত স্টিমার পরিষেবা চালু করে। পরবর্তীকালে, বরিশাল নদীবন্দরটি আন্তঃজেলা এবং বাংলাদেশের অন্যান্য জেলা থেকে কলকাতা পর্যন্ত উভয়পথে একটি টার্মিনাস হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ স্টিমার কেন্দ্র হয়ে ওঠে । জেলার অভ্যন্তরেও বেশ কয়েকটি ফিডার পরিষেবা বিদ্যমান ছিল। এটি পরবর্তীকালে ভারতের জেনারেল নেভিগেশন, রিভার স্টিম নেভিগেশন, ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় জেনারেল রিভার স্টিমার সংস্থাগুলির আঞ্চলিক সদর দফতর হয়েছিল যা বাংলার উত্তর ও পূর্ব অংশকে তৎকালীন রাজধানী দিল্লি ও কলকাতা শহরের সাথে সংযুক্ত রাখে পূর্ববাংলাকে।
১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের পরে পাকিস্তান রিভার স্টিমার সার্ভিসেস (পিআরএস) গঠন করা হয়েছিল এবং ১৯৫৮ সালে এটি পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (ইপিআইডব্লিউটিএ) এর কাছে হস্তান্তরিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন অধ্যাদেশের আওতায় গঠিত ‘ইপিআইডব্লিউটিএ বরিশাল নদীবন্দরকে ১৯৬০ সালে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে, ইপিআইডব্লিউটিএর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লুটিএ), যা বর্তমানে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের সমস্ত সম্পর্কিত উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, এবং পরিচালন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
বরিশাল বন্দরটি নৌপথের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করে পরিবহণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটি মংলা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্যান্য নদী বন্দরসমূহের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার মধ্যে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে বিবেচিত হয়।এছাড়াও বরিশাল বিভাগের অভ্যন্তরীণ জেলা ও উপজেলায় নৌ যোগাযোগ আরো সমৃদ্ধ করেছে এই বন্দরটি।
বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে বরিশাল নদী বন্দরে ৯.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক নদী টার্মিনাল এবং জেটি নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। পরে এটি আবার সংশোধন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকার ২০০৫ সালে ১৫৫৪ বর্গমিটার জমিতে আধুনিক টার্মিনাল ভবন, ১৫০০ বর্গমিটার পার্কিং ইয়ার্ড, ১২০০ মিটার ইস্পাত সীমানা নির্মাণে প্রায় ১৭.৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বন্দর উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প অনুমোদন করে। এই প্রকল্পের আওতায় ছিল রক্ষণাবেক্ষণ প্রাচীর, ৭১৪ মিটার ওয়াকওয়ে, ১০০০ বর্গ মিটার কার্গো শেড, ৪০০ বর্গমিটার ট্রানজিট কার্গো শেড, আধুনিক লোডিং এবং আনলোডিং সুবিধাসহ ১২০ ফুট দীর্ঘ ছয়টি পন্টুন, চারটি ইস্পাত গ্যাংওয়ে, যাত্রীবাহী লাউঞ্জ এবং স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধাসমূহ।যা প্রায় সবটাই এখন চরম অযত্ন ও অবহেলায় নষ্ট হবার উপক্রম।  টিকিট ঘরগুলো ছাড়া বাকী সব ঘরগুলোতে সবসময় তালা ঝোলে। এমনকি যাত্রীদের বিশ্রামের ঘরগুলোও কোনোদিন খোলা হয়না বলে অভিযোগ স্থানীয় যাত্রী সাধারণের।
২০১০ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া বরিশাল নদীবন্দর বিকাশ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পটি ২০১১ সালের শেষের দিকে সম্পন্ন হয় । ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন বন্দরের উদ্বোধন করেন। আর মাত্র ৮ বছরের ব্যবধানে এই বন্দরের বর্তমান অবস্থা ৮০ বছরের বৃদ্ধ যেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here