উন্নয়নের বরিশাল ছয়ঃ ব্যানার-পোস্টারে ঐতিহ্য ঢেকে যায়

আরিফ আহমেদ
যে পোস্টার ও ব্যানারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বরিশালে ইউএনও মেয়র দ্বন্দ্ব হলো।  হামলা, মামলা ও পাল্টা মামলার ঘটনা ঘটে গেল তা ছিলো প্রচণ্ড হাস্যকর ও লজ্জার। অন্যভাবে বলা যায়,  এটা ছিলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই বহিঃপ্রকাশ।
কেননা, নগরীর রাজা বাহাদুর সড়ক মোড়ের ব্যানারগুলো তারই প্রমাণ বহন করে দাড়িয়ে আছে  এখনো এবং নির্লজ্জ অহংকারে ঢেকে রেখেছে  বরিশাল শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক চমৎকার একটি স্থাপনা।
বরিশাল জেলা স্কুলের সামনে মসজিদ সংলগ্ন এই স্থাপনাটি শহরের মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম চেয়ারম্যান প্যারীলাল রায় এর ব্যবহার করা গাড়ি। যা প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হীরন এভাবে সংরক্ষণ করে রাখেন। আর তাঁর সেই সংরক্ষণকে উপহাস্য করে তুলেছেন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও তার দলীয় বিভিন্ন  পোস্টার ও ব্যানার।
প্যারীলাল রায় ছিলেন বরিশাল মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম চেয়ারম্যান। যার এই স্থাপনা মনে করিয়ে দেয় বরিশালের আদি ইতিহাস। হেঁটে আসতে হয় ইতিহাসের পাতায়।
১৮৭৬ সালে মিউনিসিপ্যালিটি অ্যাক্ট দ্বারা বরিশাল শহরকে মিউনিসিপ্যালিটি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে ১ জন চেয়ারম্যান, ১ জন ভাইস চেয়ারম্যান ও ১৫ জন কমিশনার দ্বারা মিউনিসিপ্যালিটি গঠন করা হয়। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, কমিশনারদের মধ্যে ১০ জন নির্বাচিত, ৪ জন মনোনীত ও ১ জন প্রাক্তন কর্মকর্তা। জনসাধারণের মধ্যে থেকে প্যারীলাল রায় কে করা হয় বরিশাল মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম চেয়ারম্যান।
সেসময় বরিশাল মিউনিসিপ্যালিটির আয়তন ছিল ৭ বর্গমাইল (১৮.১৩ বর্গ কিলোমিটার। ও জনসংখ্যা ছিল ১২,৫০১ জন।
প্রতিষ্ঠাকালে বরিশাল মিউনিসিপ্যালিটির ওয়ার্ড ছিল ২টি, পাকিস্তান আমলে, বাড়িয়ে ১০ ওয়ার্ড করা হয় ও শহরের আয়তন হয় ২০ বর্গকিলোমিটার ও জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ।
বাংলাদেশ স্বাধীনের পূর্ব পর্যন্ত এ মিউনিসিপ্যালিটির ১০টি ইউনিয়নের নির্বাচিত মেম্বারদের ভোটে একজন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন। এই ধারাবাহিকতায় দ্বারকানাথ দত্ত, অশ্বিনী কুমার দত্ত প্রমুখ চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পৌরসভার আয়তন বাড়িয়ে ২৫ বর্গকিলোমিটার করা হয়। এ সময় বর্তমান মেয়র এর বাবা ও বরিশাল আওয়ামী লীগের বর্তমান ধারক বাহক আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এরপর আব্দুর রহমান বিশ্বাস, গোলাম মাওলা প্রমুখ চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে বরিশাল পৌরসভাকে প্রথম শ্রেনীর পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন এম এ কামাল ছিলেন চেয়ারম্যান।
পরবর্তীতে সিটি কর্পোরেশন স্থাপনকল্পে “বরিশাল সিটি কর্পোরেশন আইন, ২০০১” প্রণীত হয় ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে একটি স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়৷ এই আইন ২০০২ সালে সংশোধিত হয়ে “বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (সংশোধন) আইন ২০০২” প্রণীত হয় ও ২৫ জুলাই ২০০২ আনুষ্ঠানিক ভাবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয়। প্রথম নির্বাচিত মেয়র বিএনপির মজিবর রহমান সরেয়ার। ২৫ বর্গকিলোমিটার থেকে বর্ধিত এর আয়তন দাঁড়ায় ৫৮ বর্গকিলোমিটারে।
জেলা স্কুল,  সার্কিট হাউস ও বরিশাল ক্লাবকে ঘীরে রাজা বাহাদুর সড়কের চৌরাস্তা মোড়ের জেলা স্কুল মসজিদ সংলগ্ন এই স্থাপনায় বসানো জীপ গাড়িটি প্রশ্ন তোলে- এটি কার গাড়ি? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হেঁটে আসা ইতিহাস বলে দেয় বরিশালের পরিচয়। গর্বিত এই পরিচয় ব্যানার ও পোস্টারে ঢেকে রাখা কি অপরাধ নয়? ইউএনও মুনিবুর রহমান এর বাসার সামনের ব্যানার সরানোর আগে কি তিনবছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা এগুলো সরানো জরুরী ছিলোনা? এ প্রশ্ন বরিশালের প্রায় প্রতিটি মানুষের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here