সরদার ফজলুল করিম

রেসকোর্সের সেই ময়দানও আজ আর নেই। সে এখন মনোরম উদ্যানে পরিণত হয়েছে। তার একদিকে ছোটদের আনন্দ উদ্যান তৈরি হয়েছে। এই আনন্দ উদ্যানের পাশেই নাকি ঘটেছিল আত্মসমর্পণের সেই ঘটনা। কিন্তু সে স্থানকে ঘিরে কোনো বেষ্টনী দেওয়া হয়নি। কোনো স্থানে লেখা নেই: ‘এই সেই স্থান যেখানে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধের পরিণতিতে ঔপনিবেশিক পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয়ের পরে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান সংঘটিত হয়েছিল।’ না, এ রকম লিপি কোথাও নেই।

দূর সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ তৈরি হয়েছে। দেশ ও বিদেশের অভ্যাগতদের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন ওখানেই ঘটে। কিন্তু সাভারের স্মৃতিসৌধের সঙ্গে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানগত সেই প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই, যে সম্পর্কটি রয়েছে রমনা রেসকোর্সের। কিন্তু ’৭৫-এ শেখ মুজিব এবং তাঁর সাথিদের হত্যাকাণ্ডের পর যত সরকার এল আর গেল, তারা কেউ রেসকোর্সের এ ঘটনার স্মৃতিকে রক্ষা করার প্রয়োজন বোধ করল না। বরং এই সম্পর্কটির কথা সহজে যেন মানুষের স্মৃতিতে ভেসে উঠতে না পারে, তার জন্য গাছগাছালিতে ঢেকে দেওয়া হয়েছে স্মৃতিবাহক পাকবাহিনীর সেই আত্মসমর্পণের জায়গাকে।

আমি আজও, এই ’৯৩-তে যখন বেঁচে আছি। তখন ২২ বছর আগেও সেদিন দৈহিকভাবে বেঁচেছিলাম। তবু রমনা রেসকোর্সে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘটনার বিবরণ—এর অধিক আমি নিজের মনের দিকে চেয়ে নিজের কাছেও দিতে পারছি না।

আসলে আমি বিজয় দেখিনি। বিজয় বলতে যদি স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার উত্তোলন হয়, যদি শত্রুপক্ষ-পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানকে সাক্ষাৎভাবে দর্শন করা হয়, তবে আমি ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দেখিনি।

আমি আর জনাব কামরুদ্দীন আহমদ দুজনেই ছিলাম ’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দী। কামরুদ্দীন সাহেবের নাম আজকের তরুণদের কাছে না হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ছাত্র এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছে একটি পরিচিত নাম। তাঁরই ছেলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে শহীদ হয়েছে যত ছাত্র যুব যোদ্ধা, তাদের অন্যতম এক যুবক: নিজামুদ্দীন আজাদ। বেতিয়ারার খণ্ডযুদ্ধের স্মৃতিচারণায় তার সাথিরা এখনো তার গৌরবময় যুদ্ধের কথা স্মরণ করে।

আমি আর কামরুদ্দীন সাহেব একই দিন গ্রেপ্তার হয়েছিলাম: ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। আমাকে পাকবাহিনীর গুপ্ত পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল বাংলা একাডেমি থেকে। কামরুদ্দীন সাহেবকে তাঁর আইন ব্যবসায়ের একটি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান থেকে। গ্রেপ্তারের পর নিয়ে গেল সামরিক বাহিনীর অন্যতম নির্যাতন কেন্দ্র এমপি হোস্টেলে। দৈহিক নির্যাতন কিছু করল না। বসিয়ে রাখল সারা দিন। কী একজন মেজর, না কর্নেলের সামনে হাজির করল। আমাকে উদ্দেশ করে একটা হাবিলদার, না মেজর গালি পাড়ল ‘তাজউদ্দীনের বেজন্মা চেলা বলে’, ‘বাস্টার্ড সন্স অব তাজউদ্দীন’ বলে। কে একটা অফিসার ডেকে সামনে নিয়ে তৎনগদ দণ্ড শুনিয়ে দিল: কামরুদ্দীন সাহেবের ছয় মাস, না এক বছর। আর আমার দুই বছর। আমাদের দুজনার কারও মুখেই কোনো আদেশ বা আচরণের কোনো প্রতিক্রিয়ার ছাপ ফোটেনি। আসলে আমাদের অসাড় মনে আদৌ কোনো আশা-নিরাশার প্রতিক্রিয়া ঘটেনি। সন্ধ্যার দিকে আমাদের দুজনের বামহাত-ডানহাত মিলিয়ে হাতকড়া পরাল। দুজনের কোমরে দড়ি বাঁধল। একটা জিপে তুলল। তার পরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে গেল। ভাবলাম তবু ভালো, ক্যান্টনমেন্ট নয়।

কিন্তু ক্যান্টনমেন্ট বা ঢাকা জেল: সবখানেই প্রতিমুহূর্তের চেতন-অবচেতনে আমাদের আশঙ্কা নিহত হওয়ার। নিহত হওয়া তখন নিত্য মুহূর্তের ঘটনা ছিল। বেঁচে থাকাটাই বিস্ময়ের এবং সেই ’৭১ পেরিয়ে আজকের ’৯৩-এর ১৬ ডিসেম্বরেও তথাকথিতভাবে জীবিত থাকা আমার নিজের কাছে এক বিস্ময়ের বিস্ময়।

ঢাকা জেলের দোতলা ‘নতুন বিশ ডিগ্রির’ সেলে বসে আমরা যে বাইরের পরিস্থিতির একেবারে আঁচ পাচ্ছিলাম না, তাও নয়। আমাদের ডিগ্রি থেকে জেলের পাশের যে বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছিল, তার ছাদে ১৪-১৫ ডিসেম্বরের দিকে দেখেছিলাম সশস্ত্র পাক বাহিনীকে পজিশন নিতে। আকাশে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সঙ্গে ভারতের জঙ্গিবিমানের যুদ্ধ: ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া নিজের চোখে দেখেছি। একদিন দেখলাম, কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পরে একটা বিমান জ্বলতে জ্বলতে জিঞ্জিরার দিকে পড়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার দিকে খবর পেলাম, ওটা নাকি মিত্রবাহিনীরই বিমান এবং বিধ্বস্ত বিমানের পাইলট নাকি পাকিস্তানের হাতে বন্দী হয়েছে। এমন খবরে দুঃখ পেয়েছিলাম। কিন্তু তবু জানতাম, বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। পরাজয় তার অনিবার্য। কেবল সময়ের ব্যাপার। আকাশযুদ্ধের গোলাগুলির অংশ আমাদের জেলখানাতেও এসে পড়ছিল। জেলের বাঙালি সিপাহি আর অন্য বন্দীরা তার নমুনা সংগ্রহ করে এনে আনন্দের সঙ্গে আমাদের দেখত। মিত্র ভারত বাহিনীর অধিনায়ক পাকিস্তান বাহিনীকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণ করতে বলে যে প্রচারপত্র বিমান থেকে ছড়াচ্ছিল, তার কিছু জেলখানাতে পড়েছিল। আমরা তা দেখেছিলাম।

১৬ ডিসেম্বর ঘটেছিল আত্মসমর্পণ। কিন্তু সে কি সকালে, না বিকেলে? আমি তা জানি না। একটা অত্যদ্ভুত অকল্পনীয় উত্তেজনাকর ঘটনা। যদি সম্ভব হতো, তাহলে ভীত-চকিত আমিও কি সেদিন সেই মুহূর্তে হাঁটি হাঁটি পা পা করে সেই অনুষ্ঠানের কাছে ঘেঁষতে চেষ্টা করতাম না?

কিন্তু তা করা আমার পক্ষে সেদিন সম্ভব হয়নি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। সেদিনও আমি এবং কামরুদ্দীন সাহেব বন্দী ছিলাম ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে।

আইন মানা লোক আমরা। কামরুদ্দীন সাহেব প্রবীণ আইনজ্ঞ। আদর্শরকম ভদ্র। আচার-আচরণে। মৃদুভাষে। আমিও জেলখাটা লোক ছিলাম সেদিনও। কিন্তু আইন মানা। মনে করতাম: রাষ্ট্র এবং সরকার, ভালো হোক, মন্দ হোক, তা আইনের মাধ্যমে চলবে। এবং রাষ্ট্রের মানুষ আইনকে মেনে চলবে। আর তাই ’৭১-এর আগে যত কিস্তিতেই জেলে যেতে হোক না কেন, প্রত্যেক কিস্তিতেই অপেক্ষা করেছি, জেলের বন্দিত্ব থেকে মুক্তিলাভের আনুষ্ঠানিক আদেশের: ‘রিলিজ অর্ডারের।’

কিন্তু ১৯৭১-এ কী করব আমরা? ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর? আমরা জানতাম না আমরা দুজন কী করব? কেউ কোনো রিলিজের অর্ডার দিল না। নিজের খুপরি ছেড়ে যে জেলের মেইন গেটে দেখতে যাব। ব্যাপারটা কী হচ্ছে, তেমন বিনা হুকুমের লোকও আমরা নই। আসলে কী অদ্ভুত রকমের গোবেচারী আর পদার্থহীন! কিন্তু তাই বলে জীবনকে জানার আগ্রহ এবং কৌতূহল কম ছিল না। দেখি না কী হয়? এরপরে কী হয়?

আমাদের জীবনে আনন্দকর সেই ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭ ডিসেম্বর সকালে। কয়েকজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের গেট খুলে দিয়েছিল। তারপরে অন্য বন্দীদের জন্য আর সবার অপেক্ষা ছিল না। শত শত দণ্ডিত এবং হাজতি বন্দী মুহূর্তের মধ্যে জেল গেটে জমায়েত হয়ে কারও নির্দেশের অপেক্ষা না করে জেলের পোশাক ছুড়ে ফেলে প্রায় বস্ত্রহীন অবস্থায় মুহূর্তের মধ্যে ঢাকা জেলের সামনে নাজিমউদ্দীন রোড দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

পেছনে থাকার মধ্যে জেলের ভেতরে পড়েছিলাম, আমরা দুজন: আমি আর জনাব কামরুদ্দীন। তখন জেল গেটে এসে দেখলাম: কয়েকজন জেল অফিসার বসে আছেন। আমরা তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম: ‘এখন আমরা কী করব?’ কী হাস্যকর প্রশ্ন! অফিসার কজন আদব-দুরস্তভাবে বললেন: স্যার, আমাদের কিছু বলার নেই। এখন তো কোনো আইন নেই, হুকুম নেই। আমরা কী বলব?

তাঁরাও বাঙালি। চাকরি করেছেন। চাকরির দায়িত্ব পালন করেছেন। তবু তাঁদের এ কথা যথেষ্ট। সেই মুহূর্তটি ছিল যথার্থই একটি শূন্যতার মুহূর্ত। আমাদের দুজনার জীবনে কেউ আর কোনো দিন এমন মুহূর্তের সাক্ষাৎ লাভ করিনি।

আমাদের চোখে-মুখে তখনো বিস্ময়ের ঘোর। আমি স্মরণ করতে পারছি না সেই ১৭ ডিসেম্বর (’৭১) তারিখে সকাল ১০টা কিংবা ১২টায় আমরা কীভাবে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। কামরুদ্দীন সাহেবের জন্য কেউ কি এসেছিলেন জেল গেটে? প্রৌঢ় মানুষ তিনি, কেমন করে তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের বোঝাটি নিয়ে নিজের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন! রিকশা বা যানবাহন বলতে তখন কিছুই ছিল না। আমাদের দুজনার মধ্যে কোনো বিদায় সম্বোধন উচ্চারিত হয়েছিল কি না, তাও স্মৃতিতে নেই।

আমার নিজের বোঝাটি কাঁধে নিয়ে জেল গেটের বাইরে রাস্তায় পা দিতে কেবল দেখেছিলাম জেল থেকে সদ্য বেরিয়ে যাওয়া শত শত বন্দীর পরিত্যক্ত কয়েদি পোশাকের স্তূপ। সেই স্তূপের মধ্য দিয়ে আমি আর এক বন্দী ১৭ ডিসেম্বর মুক্তির সড়কে পা দিয়েছিলাম।

১৬ ডিসেম্বর নয়, ১৭ ডিসেম্বরের এই খণ্ডচিত্রটি আমার স্মৃতিতে এখনো থেকে থেকে ভেসে ওঠে।…

সূত্র: বিজয়ের মুহূর্ত, সরদার ফজলুল করিম, সম্পাদক: মতিউর রহমান, প্রথমা প্রকাশনী

সরদার ফজলুল করিম: প্রয়াত প্রগতিশীল বুদ্দিজীবী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here