আমাদের এ করুণ দুঃসময়ে শিশু সংগঠনগুলোর এবং দাদাভাইদের ভীষণ প্রয়োজন

১.
আমাদের প্রজন্মের তরুণ শিশুসাহিত্যিকদের এখন করুণ দুঃসময়! নেই ভালো কোনো পত্রিকা। নেই ভালো কোনো সম্পাদক। নেই ভালো কোনো সংগঠন ও সংগঠক! হাহাকার! ভীষণ হাহাকার… আমরা পত্রিকায় লেখা পাঠাই। ছাপা হয় না। কেন ছাপা হয় না তাও জানিনা। কোনো পরামর্শও পাই না। এমনকি লেখাটি কি সম্পাদকের চোখে পড়েছে তাও জানতে পারি না।
কিন্তু শুনেছি রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই দৈনিক ইত্তেফাকের ‘কচি-কাঁচার আসর’ শিশুপাতাটি দেখতেন। লেখায় ভুল-ত্রুটি দেখলেই বলতেন নতুন করে লিখে নিয়ে আসো। পরম যত্নে লেখাগুলো ছাপতেন। মফস্বলের লেখকদের সাথেও যোগাযোগ করতেন। পরামর্শ দিতেন। শাসন করতেন। কাগজে-কলমে শিখিয়ে দিতেন পরম যত্নে ও স্নেহে।
রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ‘কচি-কাঁচার আসর’ নামের শিশু সংগঠনের মাধ্যমেই দেশজুড়ে তৈরি করেছিলেন লেখক গোষ্ঠী। আবৃত্তিশিল্পী। চিত্রশিল্পী। আজ তাঁরা প্রত্যেকেই খ্যাতনামা। উদাহরণ হিশেবে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন ভাইয়ার কথাই বলা যায়। লুৎফর রহমান রিটন ভাইয়ার প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়েছিল দাদাভাইয়ের হাতের ছোঁয়ায় ‘কচি-কাঁচার আসর’ এ। এবং দাদাভাই ফোনে তাৎক্ষণিক ছড়া আদায় করেছিলেন রিটন ভাইয়ার কাছ থেকেই। এরকম কতো ঘটনা, কতো স্মৃতি আছে দাদাভাইকে নিয়ে শিশুসাহিত্যিকদের।
২.
দৈনিক বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’ শিশুপাতাটি দেখতেন আফলাতুন ভাই। তখনকার সময়ে সবচে’ আধুনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি। পাতাটি শাদাকালো হলেও রঙে-গুণে-মানে চকচকে ঝকঝকে ছিল।
আফলাতুন ভাই লেখাগুলো দেখতেন লাল কালির কলমে। লেখায় ভুল-ত্রুটি দেখলেই গোল চিহ্ন দিয়ে বলতেন এগুলো ঠিক করে নিয়ে আসো। পরামর্শ দিতেন। কীভাবে লেখায় উন্নতি করা যায়। গল্পগুলো কীভাবে লিখতে হয়। তখনকার সময়ে দৈনিক বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’য় যাঁদের লেখা ছাপা হতো তাঁদেরকেই লেখক হিশেবে গন্য করা হতো।
৩.
তখনকার সময়ে রফিকুল হক দাদুভাই দেখতেন দৈনিক পূর্বদেশের ‘চাঁদের হাট’। কতো মমতা নিয়ে লেখাগুলো দেখতেন। সম্পাদনা করতেন। কতো নবীন ও তরুণ লেখকদের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল দাদুভাইয়ের ‘চাঁদের হাটে’। আহা! লেখকেরা কতোই না আনন্দ করেছিলেন তখন। বর্তমান সময়ের সব জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিকদের লেখা ছাপা হয়েছিল ‘চাঁদের হাটে’ দাদুভাইয়ের হাতের ছোঁয়ায়।
রফিকুল হক দাদুভাইও ছিলেন সংগঠক। ‘চাঁদের হাট’ নামে শিশু সংগঠন করতেন। এই সংগঠনের মাধ্যমেই তৈরি করেছিলেন আজকের সকল জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিকদের। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ভাইয়ার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল দাদুভাইয়ের হাতের ছোঁয়ায় ‘চাঁদের হাট’ এ।
৪.
সত্তুর, আশি ও নব্বই দশকে দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’। ‘খেলাঘর’ নামে শিশু সংগঠনও ছিল। দৈনিক আজাদের ‘মুকুলের মাহফিল’। এছাড়াও সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’। মাসিক ‘নবারুণ, ধান শালিকের দেশ, শাপলা শালুক ইত্যাদি পত্র-পত্রিকাগুলো লেখক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তখনকার সময়ে পাতাগুলো ছিল শাদাকালো। অথচ একেকটা পাতার সেটআপ, মেকআপ, ইলাস্ট্রেশন ছিল চকচকে ঝকঝকে। সজীবতায় রঙিন।
তখনকার সম্পাদকরা শিশুদের মনোজগৎ বুঝতেন। সম্পাদকরা ছিলেন একেকজন খাঁটি শিশুসাহিত্যিক। শিশুদের উপযোগী করে পাতাগুলোর লেখা ও অলংকরণ সাজাতেন। কিন্তু এখনকার সম্পাদকরা কয়জন শিশুসাহিত্যিক? বেশিরভাগই সাংবাদিক। রিপোর্টার। কিংবা ফিচার সম্পাদক।
৫.
যদি আজকে দেশসেরা জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিকদের জিজ্ঞেস করা হয় আপনাদের লেখক হওয়ার পেছনে সবচে’ বেশি কাঁদের অবদান? সেকেন্ডেই উত্তর আসবে দাদাভাই, আফলাতুন, হাবীবুর রহমান ও দাদুভাইদের নাম। কচি-কাঁচার আসর, চাঁদের হাট, খেলাঘরের মতো শিশু সংগঠনগুলোর নাম।
কিন্তু আমাদের এ করুণ দুঃসময়ে যাঁরা শিশুসাহিত্যে টিকে যাবে তাঁরা কাঁদের অবদানের কথা স্বীকার করবেন? কোন কোন শিশু সংগঠনগুলোর কথা স্মরণ করবেন? আমাদের কি দেখার কেউ নেই? আমাদের এ করুণ দুঃসময়ে দাদাভাইদের প্রয়োজন নয় কি? আমরা কি পাবো না আমাদের সময়ের দাদাভাইদের?
[ লেখক: ছড়াকার ও সম্পাদক,শিশুটামি। ]