আরিফ আহমেদ । বরিশাল থেকে।  
টলমল পায়ে হাঁটার শক্তি নেই। গায়ে জ্বর। কাঁপতে কাঁপতে পরে যাচ্ছেন বারবার। কোনোভাবে দেয়াল ধরে চলছেন আর পাশ দিয়ে পথচারী যাকেই যেতে দেখছেন তাকেই ডেকে বলছেন – শাঁক নেবেন বাবা, তিনরকম শাঁক আছে। দুই মুঠ নিইয়ে যান, মুই দুগ্গা চাউল কিনমু।  আইজ দুইদিন পোলা আর নাতিডা লইয়া না খাইয়া আছি। আমাগো একটু বাঁচতে দেন।’
একজন মায়ের এই আহাজারী কানে যেতেই  বিবেকবান মাত্রই থমকে যাবেন । যদিও করোনাকালীন লকডাউনের মধ্যে সড়কে রিকসা চালক আর সংবাদকর্মী ও প্রশাসনের লোক ছাড়া কেউ ছিলোনা এ পথে। একজন পথিকের সহানুভূতি দেখে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ নামিয়ে নিজেও ধপাস করে বসে পরলেন ফুটপাতে।  বরিশাল সদর রোডের লুকাস মোড়ে করোনাকালীন লকডাউন সময়ের শেষ দিকের শনিবার রাতে এই মায়ের ঝুলি থেকে বের হওয়া কলমি, কচু ও অচেনা নামের কিছু শাঁক প্রত্যক্ষ করেছিল প্রতিবেদকসহ একজন ট্রাফিক পুলিশ ও একজন রিক্সাচালক।
কঠিন এই লকডাউনের ভিতরে, অসুস্থ শরীরে এক মায়ের শাঁক বিক্রি করে জীবীকা নির্বাহের চেষ্টা কতটা মর্মান্তিক হতে পারে তা স্পষ্ট হয় তার সাথে আলাপের পরে।
অর্থাভাবে স্কুলের বেতন দিতে পারেননি তাই লজ্জায় আত্মহত্যা করেছে এক সন্তান তার। লকডাউনে কাজ নেই বলে গৃহবন্দী জীবন ছোট ছেলেটির। মেয়ের ঘরের ছোট্ট শিশুটিও পথচেয়ে আছে নানী খাবার নিয়ে ফিরবে ঘরে।
নাম তার ফুলবানু। স্বামী জালাল রাঢ়ী। তিনি বলেন মৃত জালাল রাঢ়ী। আসলে মৃত নন, অন্য আরেকটি বিয়ে করে বউ সন্তান ফেলে চলে গেছেন তিনি ছোট ছেলেটির জন্মের পরই। ফুলবানু বলেন, তিন সন্তানসহ আমাকে ফেলে চলে গেছে। তাই ভোটার কার্ডেও কইছি মইরা গ্যাছে।
একে একে জানা যায় শোকগাথা  ফুলবানুর কথা। জানাযায় মাত্র দুবছর আগে তার পরিবার জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল। হাঃ এই সেই মা! যার সন্তান সোনিয়া আক্তার (১৩) ৭ম শ্রেণির ছাত্রী ছিলো ও স্কুলের বেতন দিতে না পারার লজ্জায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো ৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৮ সালে। মেয়েটি  তার  স্থানীয় নয়গাঁও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণিতে পড়তেন।  মাত্র দুবছর আগে পত্রিকার শিরোনাম হওয়া এই মায়ের অস্তিত্ব বেমালুম ভুলে গেছেন এখানের প্রশাসন।
ফুলবানুর  পিতা আক্কেল আলী শরীফ ও বেঁচে নেই। থাকলে হয়তো রুইয়ার পোল এলাকায় মাসে ২০০০ টাকায় ভাড়া থাকতে হতোনা তাকে। দুই মেয়ে বিয়ের পর থেকে শশুরবাড়িতে থাকলেও দারিদ্র্য জীবন। তাদের মাকে সাহায্য করার অবস্থা নেই। ছোট একমাত্র ছেলে রবিউলকে নিয়ে রুইয়ার পুলে ঘরভাড়া করে থাকেন তিনি।
২৭ নং ওয়ার্ড এর ভোটার হয়ে অন্য এলাকায় থাকার অপরাধে কাউন্সিলর  নুরুল ইসলাম কোনো সাহায্য দিতে নারাজ।  তাই শাঁক বিক্রি করতে নেমেছেন রাতের আঁধারে।। এভাবেই নিজের অবস্থা তুলে ধরেন ফুলবানু।
সরেজমিনে ফুলবানু নামের এই মাকে তার দেয়া ঠিকানায় খুঁজতে গেলে বিস্মিত হতে হয় এলাকাবাসীর কথায়।
লকডাউন শেষে আগষ্টের শেষের রবিবার দুপুরে রুইয়ার পোল কালভার্টের পাশের দোকানে জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার দেখিয়ে দিলেন ফুলবানুর ঘর। আশেপাশের মানুষদের অনেকেই আক্ষেপ করে বললেন,  প্রধানমন্ত্রীর মুজিব শতবর্ষের উপহারের ঘর পাওয়া উচিত ছিলো এই ফুলবানু ও তার মতো অসহায়ের। এখানে ফুলবানুর মতো অসহায় আরো কয়েকঘর মহিলা আছেন।  তাদের কারোই স্বামী নেই। কারো কারো কোনো সন্তানও নেই।
টিনের ছাপড়ার বেশ সাজানো, পরিচ্ছন্ন একটি ঘরে ভাড়া থাকেন ফুলবানু। পরিচ্ছন্নতার হিসেবে বোঝা যায় একসময় আভিজাত্য ছিলো, আজ সহায় সম্বলহীন দৈন্য অবস্থা।
সাংবাদিক দেখে ছুটে এলেন তার ঘরের মালিক। জানালেন,  ভাড়া বাকী তবুও কত উদার তিনি। অন্য কেউ হলে তাড়িয়ে দিতো। তিনিও বললেন,  সরকারি সহযোগিতা কিছুই পায়নি ফুলবানু ও তার প্রতিবেশী নাজমা বেগম।
ফুলবানুর ছোট্ট ছেলেটির নাম রবিউল। স্কুলে পড়ার ফাঁকে কাজ খুঁজছে এখন। লকডাউনে ওকে আটকে রেখে মা নিজেই যান শাঁক বেঁচতে।
করোনাকালীন সংকটে কাজহীন হাজারো মানুষের ভিড়ে হয়তো হারিয়ে যাবেন ফুলবানু। কারণ, এ সমস্যায় ফুলবানু একা নয়। আরো কতশত ফুলবানু এভাবেই প্রতিদিন হন্য হয়ে খাদ্য খোঁজেন রাস্তায় ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here