ডয়চে ভেলে। ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নামে নতুন রাজনৈতিক জোট আসছে আগামী মাসেই। সাতটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত এই মঞ্চের নেতৃত্বে থাকছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে মাঠে নামবে এই মঞ্চ। নতুন এই মঞ্চকে কিভাবে দেখছে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি? কারাই বা আছে এই জোটে? সরকার বিরোধী আন্দোলনে কতটুকু ভূমিকা রাখবে নতুন এই জোট? তা নিয়েই এখন চলছে আলোচনা।

আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাড়িতে রবিবার বৈঠকে বসেন নতুন জোটের নেতারা। সেখানেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ছাড়াও নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন প্রাথমিকভাবে যুক্ত হচ্ছে এই জোটে। এর মধ্যে আ স ম আবদুর রবের জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরামের ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে তোলা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক ছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বর্তমানে বিলুপ্ত। ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. কামাল হোসেন সম্প্রতি নিজেই বলেছেন ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অকার্যকর, এটি আর নেই’।

এই মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘শুধু নির্বাচনকালীন সরকার নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কাজও করবে এই জোট। পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের কথাও বলছি আমরা। মতাদর্শে মিললে যে কেউ এই জোটে আসতে পারে। জুন মাসের শেষ নাগাদ এই জোট আত্মপ্রকাশ করবে। ১১ জুন বৈঠকে দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে। যদিও বিএনপির ব্যাপারে কারও কারও আপত্তি আছে। তারপরও আমরা মনে করি, বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা আমাদের মতো মাঠে নামার চেষ্টা করছি। নতুন এই জোট মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।’

যে সাতটি রাজনৈতিক দল এই জোট গঠন করছে এদের মধ্যে চারটি দল বিএনপির পুরনো মিত্র। আর দু’টি দল নতুন মিত্র। ফলে বিএনপি যে মুহূর্তে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে, ঠিক তখনই এই মঞ্চ নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।

নতুন এই জোটকে বিএনপি কিভাবে দেখছে জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘সরকারের দমন-পীড়ন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। ফলে যে যেখান থেকে প্রতিবাদ করবে বিএনপি তাদের স্বাগত জানাবে। ফলে নতুন এই জোটকে আমরা স্বাগত জানাই। তারা যদি সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আমরা পাশে থাকব।’

আ স ম আবদুর রবের বাড়িতে অনুষ্ঠিত সাত দলের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য বহ্নি শিখা জামালী, গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ছানোয়ার হোসেন তালুকদার ও কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু ও প্রেসিডিয়াম সদস্য নঈম জাহাঙ্গীর, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতা।

এতদিন আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলে রাজনীতিক করা ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের কাছে এই জোটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে নিয়ে এখনও আমাদের কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা যাদের নিয়ে এই জোট করছি, তাদের সঙ্গে আমাদের চিন্তার মিল আছে। সরকারের দমন-পীড়নের কারণে মাঠে একা টিকে থাকা মুশকিল। ফলে ছোট ছোট শক্তিগুলো যদি আমরা একত্রিত হই তাহলেও কিছুটা হলেও প্রতিরোধ করতে পারব। আমরা শুধু সরকার পতন চাই না, এখানে সিস্টেমে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে।’

স্বাধীনতা বিরোধী কেউ আসতে চাইলে তাদের নেওয়া হবে কি-না জানতে চাইলে নুর বলেন, স্বাধীনতার ৫১ বছর পর স্বাধীনতা বিরোধী বলে আর বিভেদ তৈরি করা যাবে না। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটের সঙ্গে যাদের রাজনীতি সাংঘর্ষিক তাদের আমরা এই জোটে নেব না।

নতুন এই মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা দু’টি দল গণসংহতি আন্দোলন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এতদিন বাম গণতান্ত্রিক জোটেরও শরিক ছিল। দল দুটি আলাদা রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ার উদ্যোগ নেওয়ায় গত বুধবার বাম জোটের এক বৈঠকে জোটে তাদের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমরা যেহেতু পৃথক রাজনৈতিক মোর্চা গড়ে তুলছি ফলে আমরা নিজেরাই আমাদের সদস্যপদ স্থগিত রাখতে বাম জোটকে অনুরোধ জানিয়েছি।’

নতুন এই রাজনৈতিক জোটকে কিভাবে দেখছে আওয়ামী লীগ? জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘নতুন যে কোনো রাজনৈতিক জোটকে আমরা স্বাগত জানাই। গণতান্ত্রিক দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে যে কারও রাজনীতি করার অধিকার আছে। কিন্তু যারা এই জোট করছে তারা আগেও তো এমন জোট করে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে সুযোগ দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে জোট হয়েছিল সেখানে জামায়াতের কোন উপস্থিতি ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই আমরা দেখলাম জোটের নেতা আ স ম রব, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো নেতারা মনোনয়ন পেলেন না, পেল জামায়াতের ২৫ জন। তখন তো তারা প্রতিবাদ করেননি। তাহলে কি আমরা ভাবব, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে তারা পুনর্বাসন করছেন? যে দলগুলো এই জোট করছে, তাদের জন্মই হয়েছে আওয়ামী লীগের বিরোধিতার জন্য। ফলে সেটা যে তারা করবে, এটা নিয়ে তো কোন সন্দেহ নেই। তারপরও তারা যদি স্বাধীনতা বিরোধীদের বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে বা জোট করে তাহলে আমরা তাদের স্বাগত জানাব।