আনোয়ার হোসেনকে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি

শেখ,খুলনা:
খুলনার অন্যতম বিপ্লবী ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেনকে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট জনেরা।
গত ২২ শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬ ঘটিকায় খুলনার উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরিতে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি আলোচনা সভা থেকে এ দাবী উত্থাপন করা হয়। ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু এবং খুলনার তৎকালীন রাজনীতিকে প্রতিপাদ্য ধরে অনুষ্ঠিত ঐ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক এবং সরকারি ব্রজলাল কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) শরীফ আতিকুজ্জামান। প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা প্রশাসক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল হোসেনের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও জরুরী কাজে ব্যাস্ত থাকায় তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রেভিনিউ) জিয়াউর রহমান প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন। অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে আলোচনা করেন প্রফেসর বিভূতিভূষণ মণ্ডল এবং ভাষা আন্দোলন পর্বে খুলনার তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর আনোয়ারুল কাদির। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সরকারি ব্রজলাল কলেজের শিক্ষক শংকর কুমার মল্লিক।
আলোচনা সভায় বিশিষ্ট কলামিস্ট এবং উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর আনোয়ারুল কাদির বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যাবহিত পরেই ভাষার প্রশ্নে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয় সেটির মূল স্রোত ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বাংলার আনাচকানাচে। বরাবরই প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিমন্ডলের অধিকারী খুলনা জেলাতেও আছড়ে পড়েছিল ভাষা আন্দোলনের ঢেউ। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে অর্থাৎ, ১৯৪৮ সালের দিকে যাঁরা খুলনার ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন অন্যতম। খুলনা জেলা স্কুলে নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন সময়েই তিনি ছাত্র ফেডারেশনের সাথে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে ব্রজলাল কলেজে অধ্যয়নকালে বাগ্মিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা প্রভৃতির মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন নেতৃস্থানীয়দের কাতারে। আনোয়ার হোসেনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৎকালীন দৌলতপুর কলেজই ছিল খুলনায় ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ধর্মঘট আহ্বান করা হলে এই দৌলতপুর কলেজে বসেই সন্তোষ দাসগুপ্ত, স্বদেশ বসু,আনোয়ার হোসেন প্রমুখ ছাত্রনেতারা খুলনাতে ধর্মঘট সফল করার সিদ্ধান্ত নেন।
তাদের প্রচেষ্টায় খুলনাতে সেদিন সফলভাবে ধর্মঘট পালিত হয়। তবে সারাদেশের মতো খুলনাতেও আন্দোলন বানচালের জন্য পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে পুলিশ গ্রেফতার করে আনোয়ার হোসেনকে। ১৯৫০ সালের ২৪ শে এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপরা ওয়ার্ডে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে যে ৭ জন বন্দী নিহত হন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আনোয়ার হোসেন। প্রফেসর আনোয়ারুল কাদির আরো বলেন, কমিউনিস্ট বন্দীদের পৃথক স্ট্যাটাস বাতিলের দাবিতে বন্দীদের অনশন ধর্মঘটের জেরে পুলিশের গুলিতে শহিদ হলেও আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল মূলত ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে। সুতরাং অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত কারণেই আনোয়ার হোসেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিদার।
প্রধান অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রেভিনিউ) জিয়াউর রহমান বলেন, গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসের প্রকৃত তথ্য উপাত্ত উদঘাটন করতে হবে। আনোয়ার হোসেনের স্বীকৃতির বিষয়ে খুলনাবাসীর প্রচেষ্টা সফল হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সভাপতির ভাষণে শরীফ আতিকুজ্জামান বলেন, যথাসময়ে যথাযথ গবেষণার অভাবেই আনোয়ার হোসেনের মতো অনেকেই যথোপযুক্ত মর্যাদা পাননি। ইতিহাসের নির্মোহ চর্চাই আমাদেরকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। তিনি আনোয়ার হোসেনের স্বীকৃতি আদায়ে খুলনার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকে জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। এছাড়াও তিনি ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে একটা দীর্ঘ সময় ধরে ধামাচাপা দেওয়ার জঘন্য অপচেষ্টার সমালোচনাও করেন। পাশাপাশি শুধু দিবস পালন না করে ভাষা আন্দোলনের শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করার পরামর্শও দেন তিনি।